বিশেষ প্রতিবেদন, ইসলামপুর, মুর্শিদাবাদ: গণতন্ত্রের উৎসব কি তবে আতঙ্কের উৎসবে পরিণত হতে চলেছে? মুর্শিদাবাদের ৬৩ রানীনগর বিধানসভা এলাকা থেকে যে খবর সামনে আসছে, তা সুস্থ গণতন্ত্রের পক্ষে চরম লজ্জাজনক। ভোটের আগের রাতে যখন ভোটারদের নিশ্চিন্তে ঘুমানোর কথা, তখন ইসলামপুর থানার পুলিশের বিরুদ্ধে মধ্যরাতে সাধারণ মানুষের ঘরে হানা দিয়ে ত্রাস সৃষ্টির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
আইন ভেঙে অন্তঃপুরে খাকি উর্দি: আজ গভীর রাতে ইসলামপুর থানার পুলিশ কসবা গোয়াস এলাকার (বুথ নম্বর ৯৮) বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম (পিতা: আক্তার উদ্দিন মোল্লা)-র বাড়িতে অতর্কিতে হানা দেয়। সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, একদল পুরুষ পুলিশকর্মী কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই বাড়িতে ঢুকছে। আইনি নিয়ম অনুযায়ী, সূর্যাস্তের পর এবং সূর্যোদয়ের আগে কোনো নারীর উপস্থিতিতে ঘরে তল্লাশি চালাতে গেলে মহিলা পুলিশ থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ, রফিকুল ইসলামের বাড়িতে প্রবেশের সময় কোনো মহিলা পুলিশকর্মী ছিলেন না। ঘরে থাকা মহিলা ও শিশুরা এই ঘটনায় চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। প্রশ্ন উঠছে, পুলিশ কি আইন রক্ষার নামে আইন ভাঙার লাইসেন্স পেয়ে গিয়েছে?
নির্বাচনী নিরপেক্ষতা ও পুলিশের ভূমিকা: স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রফিকুল ইসলামকে স্রেফ ভয় দেখানোর জন্য এবং ভোট প্রক্রিয়ায় তাঁকে নিষ্ক্রিয় করার জন্যই এই পুলিশি অভিযান। অভিযোগের তির সরাসরি শাসকদলের বিধায়ক সৌমিক হোসেনের দিকে। বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ইসলামপুর থানার পুলিশ প্রশাসনের একাংশ এখন নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে তৃণমূলের ক্যাডারের মতো কাজ করছে। খাকি উর্দির আড়ালে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির এই খেলা সাধারণ ভোটারদের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
আকবর আলীদের ছাড়, রফিকুলদের ওপর মার!: পুলিশের এই তথাকথিত ‘সক্রিয়তা’ নিয়ে মানুষের ক্ষোভের আরও একটি বড় কারণ হলো তাদের দ্বিমুখী নীতি। সম্প্রতি আকবর আলী নামক এক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে এসে প্রকাশ্য দিবালোকে এক মহিলাকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। সেই ভিডিও ভাইরাল হলেও এবং জনমানসে তীব্র প্রতিক্রিয়া হলেও পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। স্থানীয়দের দাবি, আকবর আলী বিধায়কের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণেই সে আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে। একদিকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া অপরাধী বুক ফুলিয়ে ঘুরছে, আর অন্যদিকে ভোটের ঠিক আগে সাধারণ ভোটারদের বাড়িতে মধ্যরাতে হানা দিচ্ছে পুলিশ। এই বৈষম্য কি প্রশাসনের ‘দলদাস’ মানসিকতার প্রমাণ নয়?
নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতা কোথায়?
ভোটের আগে এলাকা দখলের রাজনীতিতে যখন প্রশাসনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন ওঠে।
- কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকা সত্ত্বেও কেন রাজ্য পুলিশকে দিয়ে ভোটারদের ভয় দেখানো হচ্ছে?
- মধ্যরাতে মহিলা পুলিশ ছাড়া কেন তল্লাশি চালানো হলো? এর জবাবদিহি কে করবে?
- যে অফিসাররা রাজনৈতিক স্বার্থে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কেন কমিশন এখনো নীরব?
জনগণ জবাব চাইছে
৬৩ রানীনগরের অলিগলিতে এখন একটাই আলোচনা—ভোট কি তবে পুলিশের ভয়ে দিতে হবে? সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই অপচেষ্টা কি সফল হবে? ভোটারদের দাবি, অবিলম্বে এই ঘটনার তদন্ত হোক এবং পক্ষপাতদুষ্ট পুলিশ অফিসারদের নির্বাচনী কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হোক।
মনে রাখবেন, নির্বাচন আসে এবং যায়, কিন্তু প্রশাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস একবার হারিয়ে গেলে তা ফিরে পাওয়া অসম্ভব। নির্বাচন কমিশনের উচিত এখনই হস্তক্ষেপ করে ইসলামপুর থানার এই অরাজকতা বন্ধ করা এবং অপরাধী আকবর আলীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে নিরপেক্ষতার প্রমাণ দেওয়া।
জনগণ জেগে আছে, জনগণ জবাব চাইছে।
