নিউজটি অডিও আকারে শুনুন
কলকাতা, ২১ জুন ২০২৫: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নতুন প্রকাশিত অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণি (ওবিসি) তালিকা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। গত ১৭ জুন, কলকাতা হাইকোর্টের বিভাগীয় বেঞ্চ এই তালিকার উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করেছে এবং রাজ্য সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। এই ঘটনা রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
নতুন তালিকা ও তার পটভূমি
তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার গত ১০ জুন, ২০২৫ তারিখে একটি সংশোধিত ওবিসি তালিকা প্রকাশ করে। এই তালিকায় ১৪০টি নতুন উপ-শ্রেণি অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যার মধ্যে ৮০টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং ৬০টি অ-মুসলিম সম্প্রদায়ের। এই পদক্ষেপটি ২০২৪ সালের মে মাসে কলকাতা হাইকোর্টের একটি রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া হয়। সেই রায়ে ২০১০ সালের পরে জারি করা ওবিসি শংসাপত্র বাতিল করা হয়েছিল, কারণ আদালত মনে করেছিল যে শ্রেণিবিন্যাস প্রক্রিয়ায় আইনি নীতি ও বিধান মানা হয়নি। আদালতের নির্দেশ ছিল, শুধুমাত্র ২০১০ সালের আগে শ্রেণিবদ্ধ ওবিসি গোষ্ঠীগুলিই সংরক্ষণের সুবিধা পাবে।
হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ ও মন্তব্য
১৭ জুন, বিচারপতি রাজশেখর মন্থা এবং তপব্রত চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন কলকাতা হাইকোর্টের বিভাগীয় বেঞ্চ নতুন তালিকা এবং এর ভিত্তিতে জাতি শংসাপত্র জারির উপর স্থগিতাদেশ জারি করে। এই আদেশ ৩১ জুলাই, ২০২৫ পর্যন্ত বা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাজ্য সরকার একটি তাড়াহুড়ো করে সমীক্ষা (মাত্র দেড় মাসে সম্পন্ন) পরিচালনা করেছে, যা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা মেনে চলেনি। আদালত নতুন উপ-শ্রেণিবিন্যাসের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং রাজ্যকে আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের জন্য সমালোচনা করেছে।
বিশেষত, আদালত উল্লেখ করেছে যে ২০১২ সালের আইন অনুযায়ী ওবিসি শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষমতা শুধুমাত্র রাজ্য বিধানসভার হাতে রয়েছে, নির্বাহী বিভাগের নয়। রাজ্যের এই পদক্ষেপকে ২০২৪ সালের রায়ে বাতিল হওয়া সংরক্ষণ পুনর্বহালের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের ফলে কলেজে ভর্তি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজ্যের ওবিসি শংসাপত্র জমা দেওয়ার অনলাইন পোর্টালও বন্ধ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এই আদেশের পর রাজনৈতিক তরজা তীব্র হয়েছে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়ে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে “সাম্প্রদায়িক তোষণ” নীতির অভিযোগ তুলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, নতুন তালিকায় মুসলিম সম্প্রদায়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, তৃণমূল নেতা কুনাল ঘোষ রাজ্যের পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি বলেছেন, সমীক্ষাটি আদালতের নির্দেশ মেনেই করা হয়েছে এবং তোষণের অভিযোগ ভিত্তিহীন। রাজ্য সরকার এই অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার পরিকল্পনা করছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের রায়ের বিরুদ্ধেও একটি আপিল সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।
ভবিষ্যৎ কী?
এই স্থগিতাদেশের ফলে পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা আরও বেড়েছে। ছাত্র-ছাত্রী এবং চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। রাজ্য সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সুপ্রিম কোর্টের রায় এই ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আপাতত, ৩১ জুলাইয়ের পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত পরিস্থিতি অনিশ্চিত রয়েছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
