স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ক্ষোভ উগরে দিয়েছে : কল্যাণ

স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ক্ষোভ উগরে দিয়েছে : কল্যাণ

নয়াদিল্লি, ১৯ জুলাই: লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) অভ্যন্তরের তীব্র ফাটল। লোকসভার আসন্ন বাদল অধিবেশন শুরুর ঠিক আগের দিন, রবিবার সেই রাজনৈতিক তরজা এক নজিরবিহীন নাটকীয় মোড় নিল। দলত্যাগী ২০ জন বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সাংসদকে লোকসভায় আলাদা বসার আসন (Separate Seating Arrangement) বরাদ্দ করেছেন স্পিকার ওম বিড়লা। স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ক্ষোভ উগরে দিয়েছে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। তাদের প্রধান আপত্তি— যেখানে দলত্যাগী সাংসদদের বরখাস্তের আবেদন (Disqualification Petition) এখনও স্পিকারের দরবারে ঝুলে রয়েছে, সেখানে কোন যুক্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল? এই পদক্ষেপকে ‘অনভিপ্রেত’ বলে কটাক্ষ করেছে ঘাসফুল শিবির।

শনিবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা তৃণমূলের ২০ জন বিক্ষুব্ধ সাংসদের জন্য আলাদা বসার আসনের আবেদন মঞ্জুর করেন। এই সাংসদরা দল ছেড়ে নবগঠিত ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া’ (NCPI)-তে যোগ দিয়েছেন। যদিও এই ২০ জন সাংসদের নতুন দলে সংযুক্তিকরণ বা ‘মার্জার’-এর বিষয়টি এখনও স্পিকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই আবহে রবিবার হুগলিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তৃণমূলের প্রবীণ সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় আমরা ইতিমধ্যেই ওই ২০ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্পিকারের কাছে বরখাস্তের পিটিশন দাখিল করেছি। সেই সমস্ত আবেদনের কোনো নিষ্পত্তি না করেই স্পিকার যেভাবে তাদের আলাদা বসার অনুমতি দিয়ে একপ্রকার স্বীকৃতি দিলেন, তা একেবারেই অনভিপ্রেত ছিল।”

সংসদের বাদল অধিবেশনকে সামনে রেখে রবিবার প্রথামাফিক একটি সর্বদলীয় বৈঠকের আয়োজন করেছিল কেন্দ্র সরকার। সেখানে কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু এনসিপিআই (NCPI)-র প্রতিনিধি হিসেবে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে আমন্ত্রণ জানান। এই ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয় গোটা বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোট। তৃণমূলের পাশাপাশি কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে, আম আদমি পার্টি এবং শিবসেনা (ইউবিটি)-র মতো দলগুলি একজোট হয়ে সর্বদলীয় বৈঠক থেকে প্রতীকী ওয়াকআউট করে।

তৃণমূল নেত্রী মহুয়া মৈত্র সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “যে ২০ জন সাংসদ মানুষের রায়কে অপমান করে দল ছেড়েছেন, স্পিকার এখনও তাদের অন্য দলে মিশে যাওয়ার আইনি বৈধতা দেননি। তা সত্ত্বেও একটি অস্বীকৃত দলকে কীভাবে সর্বদলীয় বৈঠকে ডেকে তৃণমূলের শক্তিকে খর্ব করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে আমরা সমস্ত বিরোধী দল একযোগে প্রতিবাদ জানিয়েছি।” একই সুরে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জয়রাম রমেশ এক্স (পূর্বতন টুইটার) হ্যান্ডেলে লেখেন, “মোদী সরকার যেভাবে ২০ জন দলত্যাগী সাংসদের ‘পার্কিং প্লেস’ এনসিপিআই-কে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানাল, তার প্রতিবাদেই এই ওয়াকআউট। কারণ মূল বিষয়টি এখনও স্পিকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।”

তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও লোকসভার দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী এই ২০ জন সাংসদকে পদচ্যুত করার জন্য ২০টি পৃথক আবেদন জমা দিয়েছিলেন। তৃণমূলের যুক্তি, দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে গেলে মূল দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের অন্য দলে विलय বা মার্জার জরুরি। লোকসভায় তৃণমূলের মোট ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জন চলে যাওয়ায় গাণিতিক হিসেবে তারা দুই-তৃতীয়াংশ হলেও, আইনি ও পদ্ধতিগত স্ক্রুটিনি এখনও শেষ হয়নি।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০ জুলাই থেকে শুরু হতে চলা সংসদের বাদল অধিবেশন জুড়েই এই দলত্যাগ এবং লোকসভার নতুন আসন বিন্যাস নিয়ে চরম সংঘাতের আবহ তৈরি হতে চলেছে। স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে শাসকদলের রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে বলে অভিযোগ করেছে বিরোধীরা, যার প্রভাব আগামী দিনে সংসদের অন্দরে স্পষ্ট দেখা যাবে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply