বেজিং, ১৮ জুলাই: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (AI) দুনিয়ায় বিশ্বকে চমকে দিল চিন। আমেরিকার প্রযুক্তিগত একাধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে চিনা এআই স্টার্ট-আপ সংস্থা ‘মুনশট এআই’ (Moonshot AI) বাজারে নিয়ে এল বিশ্বের বৃহত্তম ওপেন-ওয়েট এআই মডেল ‘কিমি কে৩’ (Kimi K3)। ২.৮ ট্রিলিয়ন প্যারামিটার সমৃদ্ধ এই মডেলটি মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যানথ্রোপিকের (Anthropic) ‘ক্লড ফেবল ৫’ এবং ওপেনএআই-এর (OpenAI) ‘জিপিটি-৫.৬ সল’-এর মতো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রোপাইটরি (বন্ধ সোর্স) মডেলগুলোর সমকক্ষ পারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষম বলে দাবি করা হচ্ছে। চিনের এই অভাবনীয় অগ্রগতি সিলিকন ভ্যালির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ওপেন-সোর্স বা ওপেন-ওয়েট ক্যাটাগরিতে এত বড় এআই মডেল এর আগে পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। সাধারণত ওপেন-ওয়েট মডেলগুলোর ক্ষেত্রে যে কেউ এর কোড বা সিস্টেম ডাউনলোড করে নিজের মতো করে কাস্টমাইজ বা পরিবর্তন করতে পারেন, যা জিপিটি বা ক্লডের মতো বন্ধ সিস্টেমে সম্ভব নয়। মুনশট এআই জানিয়েছে, তাদের নতুন এই কিমি কে৩ ফ্ল্যাগশিপ মডেলটি মূলত অত্যন্ত জটিল কোডিং, অ্যাডভান্সড রিজনিং (যুক্তি নির্ধারণ) এবং গভীর গবেষণামূলক কাজের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। এতে রয়েছে ১ মিলিয়ন টোকেনের বিশাল কনটেক্সট উইন্ডো, যার ফলে এটি একবারে একটি সম্পূর্ণ বিশাল কোডবেস বা শত শত পৃষ্ঠার প্রযুক্তিগত নথি অনায়াসে প্রসেস করতে পারে।
আমেরিকার নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সম্প্রতি কিছু শীর্ষ মার্কিন এআই মডেল বিশ্ববাজার থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়ার পরপরই চিনের এই পাল্টা চাল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বেঞ্চমার্কিং প্ল্যাটফর্ম ‘এরিনা ডট এআই’ (Arena.ai)-এর থার্ড-পার্টি মূল্যায়নে দেখা গেছে, ফ্রন্টএন্ড কোড তৈরির ক্ষেত্রে কিমি কে৩ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেবল ৫ এবং জিপিটি-৫.৬ সল-কে পেছনে ফেলে বিশ্বের এক নম্বর স্থান দখল করেছে। এছাড়া জটিল গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায়, যা সমাধান করতে একজন জ্যেষ্ঠ গবেষকের অন্তত এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগে, তা কিমি কে৩ মাত্র দুই ঘণ্টায় নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে দেখিয়েছে। মুনশট এআই-এর নিজস্ব রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, জিপিইউ কার্নেল অপ্টিমাইজেশনের ক্ষেত্রে এই মডেলটি জিপিটি-৫.৫ এবং ক্লড ওপাস ৪.৮-এর চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেছে।
আমেরিকান এআই সংস্থাগুলো যখন তাদের বিশাল পরিকাঠামোগত খরচ তুলতে টোকেনের দাম বাড়াচ্ছে, ঠিক তখনই চিন সম্পূর্ণ বিপরীত কৌশল নিয়েছে। মুনশট এআই এই বিশ্বমানের মডেলটির প্রতি ১০ লক্ষ ইনপুট টোকেনের মূল্য নির্ধারণ করেছে মাত্র ৩ ডলার এবং আউটপুটের জন্য ১৫ ডলার। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই আগ্রাসী ও সস্তা প্রাইসিং মডেলের কারণে বিশ্বজুড়ে ডেভেলপার এবং করপোরেট সংস্থাগুলো মার্কিন প্রযুক্তির মায়া ত্যাগ করে চিনা ওপেন মডেলের দিকে ঝুঁকতে পারে। আলিবাবা এবং টেনসেন্টের মতো চিনা টেক জায়ান্টদের বিনিয়োগপুষ্ট মুনশট এআই জানিয়েছে, আগামী ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে এই মডেলটির সম্পূর্ণ ওয়েটস (weights) বিশ্বজুড়ে সাধারণ ব্যবহার ও কাস্টমাইজেশনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। চিনের এই ঝোড়ো গতি আমেরিকার প্রযুক্তিগত নেতৃত্বকে যে বড়সড় ধাক্কা দিল, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচনা চলছে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
