নয়াদিল্লি, ৩০ জুলাই: ইউক্রেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত চর্নোমোরস্ক (Chornomorsk) বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজে আটকা পড়েছেন অন্তত ১৩ জন ভারতীয় নাবিক। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে বাড়তে থাকা রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত এবং কৃষ্ণাঙ্গ সাগর অঞ্চলে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে জাহাজটি এখন চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে। ফরওয়ার্ড সিমেন্স ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (FSUI) সোশ্যাল মিডিয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, আটকে পড়া ভারতীয় নাবিকরা বর্তমানে অত্যন্ত ‘ভয়াবহ ও জীবনঘাতী’ পরিস্থিতির মুখোমুখি এবং তারা যেকোনো মুহূর্তে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গিয়েছে, ‘এমভি আমির ১’ (MV AMIR1) নামের বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজটি বর্তমানে ইউক্রেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চর্নোমোরস্ক বন্দরে নোঙর করে রয়েছে। জাহাজটিতে থাকা মোট ১৫ জন ক্রু মেম্বারের মধ্যে ১৩ জনই ভারতীয় নাগরিক।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক জরুরী আবেদনে এফএসইউআই (FSUI) জানিয়েছে, “এমভি আমির ১ জাহাজটি বর্তমানে ইউক্রেনের চর্নোমোরস্ক বন্দরে আটকে রয়েছে। এতে থাকা ১৫ জন ক্রুর মধ্যে ১৩ জন ভারতীয় নাবিক রয়েছেন, যারা এক অত্যন্ত ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী সংকটের মুখোমুখি। জাহাজটির ঠিক কাছাকাছি এলাকায় ঘনঘন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে। যেকোনো মুহূর্তে জাহাজে সরাসরি আঘাত হানতে পারে ক্ষেপণাস্ত্র, যার ফলে নাবিকরা মারাত্মক আতঙ্কের মধ্যে প্রহর গুনছেন।”
ইউনিয়নের তরফে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে জাহাজের আশেপাশের এলাকা থেকে বিকট ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। এই চিত্র চর্নোমোরস্ক বন্দরের বর্তমান ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকটকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে ফরওয়ার্ড সিমেন্স ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া ভারত সরকার, জাহাজের মালিক পক্ষ, পতাকাবাহী রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক শিপিং কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতীয় নাবিকদের এভাবে ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ (sitting targets) বানিয়ে ফেলে রাখা যায় না। অবিলম্বে তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে স্বদেশে ফিরিয়ে আনার বা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) বা উক্ত জাহাজ পরিচালনকারী কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর আক্রমণের ঘটনা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে, যা সাধারণ নাবিকদের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে। গত এক সপ্তাহে একাধিক জাহাজে হামলা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে:
- এমভি ওমর্ফি (MV OMORFI): গত ১৮ জুলাই কৃষ্ণাঙ্গ সাগরে এই জাহাজে হামলা চালানো হয়। ঘটনায় এক ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
- এমভি গোল্ডেন লিও (MV GOLDEN LEO): ওডেসা বন্দর থেকে ছাড়ার সময় ১৯ জুলাই অন্য একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এই জাহাজে থাকা চারজন ভারতীয় নাবিক নিহত হন।
- এমভি এজিএন রাগনার (MV AGN Ragnar): ওডেসা বন্দরের কাছেই পালাউ-এর পতাকাবাহী এই জাহাজে ড্রোন হামলায় আরও দুই ভারতীয় নাবিক নিখোঁজ হন, যাদের সন্ধান এখনো মেলেনি।
কৃষ্ণাঙ্গ সাগরে পরপর ভারতীয় নাবিকদের প্রাণহানির ঘটনায় নয়াদিল্লি ইতিমধ্যে রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের তলব করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ ও কড়া প্রতিবাদ নথিভুক্ত করেছে।
আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারতের সাধারণ নাবিকদের এই বিপদ বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তাকে ফের বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখতে ও নির্দোষ নাবিকদের সুরক্ষা দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
