নয়াদিল্লি, ২২ জুলাই:দেশজুড়ে চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রবেশিকা পরীক্ষা বা নিট প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে দীর্ঘ সময় ধরে উত্তাল জাতীয় রাজনীতি। বিরোধী দলগুলির লাগাতার চাপ এবং ছাত্রসমাজের দেশব্যাপী তীব্র প্রতিবাদের মুখে অবশেষে সংসদে কিছুটা পিছু হঠার ইঙ্গিত দিল কেন্দ্র। বুধবার লোকসভায় এই বহুচর্চিত নিট প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় সম্মত হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। আর এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মতির ঠিক পরপরই এক তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকটি সংসদের অন্দরেই অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে সরকারি আধিকারিকদের সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। বাদল অধিবেশনের তৃতীয় দিনে সরকারের এই আকস্মিক নমনীয়তা এবং তৎপরতা জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিরোধী দলগুলি একে তাদের লাগাতার চাপের আংশিক ফলাফল হিসেবেই দেখছে।
দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধী শিবির নিট কেলেঙ্কারি নিয়ে সংসদের উভয় কক্ষে আলোচনার দাবি জানিয়ে আসছিল। সরকারপক্ষ এতদিন বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও, বুধবার তারা লোকসভায় স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, নিট প্রশ্নফাঁস এবং পরীক্ষা পরিচালনায় যে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে তারা একটি বিশদ বিতর্কে অংশগ্রহণ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। শুধু তাই নয়, এই বিতর্কের রূপরেখা ঠিক করার জন্য সরকার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডাকারও অনুরোধ জানিয়েছে। এই সর্বদলীয় বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হলো ঠিক কোন নিয়মের অধীনে, কোন তারিখে এবং ঠিক কতক্ষণ ধরে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা চলবে, তা সমস্ত দলের সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা। সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি মেনে সরকার যে বিরোধীদের দাবিকে মান্যতা দিতে চাইছে, স্পিকারকে দেওয়া এই প্রস্তাব তারই একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
বুধবার সংসদের বাদল অধিবেশনের প্রথমার্ধে ব্যাপক হট্টগোল ও অচলাবস্থার জেরে অধিবেশন সাময়িকভাবে মুলতুবি করে দেওয়া হয়। এরপর দুপুর ঠিক বারোটায় লোকসভার কাজ যখন পুনরায় শুরু হয়, তখন সংসদ কক্ষে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্পিকার ওম বিড়লা সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেণ রিজিজুকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি পেশ করার জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু কিরেণ রিজিজু তাঁর বক্তব্য শুরু করার আগেই লোকসভার ফ্লোরে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে হস্তক্ষেপ করেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা কে সি বেণুগোপাল। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় স্পিকার এবং সরকারপক্ষকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিরোধীদের দাবি কেবল একটি সাধারণ আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এই দুর্নীতির গভীরে গিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
কংগ্রেস নেতা কে সি বেণুগোপাল লোকসভায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন, লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে যে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে এবং নিট পরীক্ষার ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে, তার সম্পূর্ণ দায়ভার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে নিতে হবে। শুধুমাত্র সংসদে আলোচনা করলেই এই ভয়াবহ সমস্যার সমাধান হবে না, বরং শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে এই চরম অব্যবস্থা ও বিতর্ক সামলাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার কারণে ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ চাইছেন বিরোধীরা। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া নিট দুর্নীতি নিয়ে কোনো অর্থবহ বিতর্ক সম্ভব নয়। বিরোধী দলগুলো এই ইস্যুতে যে কোনোভাবেই আপস করতে রাজি নয়, বেণুগোপালের এই জোরালো দাবি তা পুনরায় প্রমাণ করেছে।
সংসদের ভেতরের এই উত্তেজনার আঁচ ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও। নিট ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে মাঠে নেমেছে বিভিন্ন আঞ্চলিক দল ও তাদের শীর্ষ নেতারা। ওড়িশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েকও এদিন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়েছেন। অন্যদিকে, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী বিজয় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, শুধুমাত্র তদন্ত নয়, নিট পরীক্ষা ব্যবস্থাকেই চিরতরে বাতিল করতে হবে। একইসঙ্গে, নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর আটক হওয়ার ঘটনা নিয়েও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। যদিও বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা প্রশ্ন তুলেছেন যে, রাহুল গান্ধী কেন প্রশ্নফাঁসের মতো বিষয়ে এত বেছে বেছে সরব হচ্ছেন। বিজেপির তরফ থেকে রাহুল গান্ধীর এই বিক্ষোভকে শিশুতোষ এবং প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরের ওই ঘটনাকে নৈরাজ্যের প্রতীক বলে কটাক্ষ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, নিট বিতর্ককে কেন্দ্র করে সরকার এবং বিরোধীদের এই সম্মুখসমর আগামী দিনে আরও বড়সড় রাজনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার জল বহুদূর গড়াতে পারে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
