লন্ডন, ১৬ জুলাই: যুক্তরাজ্যে (ইউকে) চার দশকের পুরনো একটি ঐতিহাসিক মন্দির ও কমিউনিটি সেন্টার প্রাঙ্গণ বিক্রি করা নিয়ে তৈরি হয়েছে আইনি জটিলতা ও তীব্র জল্পনা। পিটারবরো শহরের ‘নিউ ইংল্যান্ড কমপ্লেক্স’, যেখানে ‘ভারত হিন্দু সমাজ’ পরিচালিত বিখ্যাত মন্দিরটি অবস্থিত, সেটি এক মুসলিম সংগঠনের কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয় স্থানীয় প্রশাসন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়। পিটারবরো সিটি কাউন্সিলের এই সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এবার সরাসরি যুক্তরাজ্যের হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে ভারত হিন্দু সমাজ। অভিযোগ, চার দশক ধরে চলা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অবদানের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে একতরফাভাবে এই সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রশাসন।
প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, পিটারবরো সিটি কাউন্সিল নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো কমপ্লেক্সটি ‘ইউনাইটেড কিংডম ইসলামিক মিশন’ (ইউকেআইএম)-এর কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এই পদক্ষেপকে চরম অন্যায় বলে দাবি করেছে মন্দির ট্রাস্ট। তারা হাইকোর্টে অভিযোগ জমা দিয়ে জানিয়েছে, কাউন্সিল বিড মূল্যায়নে মারাত্মক কারচুপি ও ভুল পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে শহরের হিন্দু জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় উপাসনালয় এবং সামাজিক মিলনক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে আসা প্রতিষ্ঠানটির আবেদন পর্যালোচনা না করেই বিক্রি অনুমোদিত হয়।
মামলাটি জুডিশিয়াল রিভিউ বা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় আসার পর, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাইকোর্ট থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তী নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। সেই নির্দেশে আদালত স্পষ্টভাবে জানায়, বিচার বিভাগীয় শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সিটি কাউন্সিল সম্পত্তিটির চূড়ান্ত বিক্রি সম্পন্ন করতে পারবে না।
বর্তমানে উচ্চ আদালত খতিয়ে দেখছে যে, কাউন্সিল নিলাম ও সম্পত্তি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে নির্দিষ্ট আইন এবং সঠিক নিয়মকানুন সঠিকভাবে পালন করেছিল কি না। তবে মন্দির ট্রাস্ট ‘ভারত হিন্দু সমাজ’-এর পক্ষ থেকে বিষয়টি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের এই আইনি লড়াই ক্রেতা সংগঠন ইউনাইটেড কিংডম ইসলামিক মিশনের বিরুদ্ধে নয়। বরং পুরো আইনি আপত্তিটি গড়ে উঠেছে সিটি কাউন্সিলের নীতিহীন ও ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে।
ভারত হিন্দু সমাজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই মন্দির ও কমপ্লেক্সটি পিটারবরো এবং তার আশপাশের অঞ্চলে বসবাসকারী অন্তত ৪,০০০ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের একমাত্র ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র। স্থানীয় অধিবাসীদের বক্তব্য, দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে শুধু পূজার্চনা নয়, বরং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং প্রবাসীদের সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে এই নিউ ইংল্যান্ড কমপ্লেক্স।
যদি শেষ পর্যন্ত এই প্রাঙ্গণটি হাতছাড়া হয়ে যায়, তবে স্থানীয় হাজার হাজার মানুষকে প্রতিদিনের পূজা বা উৎসবের দিনে ধর্মীয় আচার পালন করতে দৌড়াতে হবে বহু দূরের শহরে। সেক্ষেত্রে নিকটতম মন্দির পেতে তাদের অন্তত ৫৬ কিলোমিটার দূরে কেমব্রিজ অথবা প্রায় ৬৪ কিলোমিটার দূরের লেস্টার শহরে যেতে হবে। যা বয়স্ক ও ছোট শিশুদের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
যুক্তরাজ্যে সম্প্রতি অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যবৃদ্ধির দরুন একের পর এক স্থানীয় কাউন্সিল চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাওয়ায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে ও ঋণ পরিশোধ করতে যুক্তরাজ্যের বেশ কয়েকটি স্থানীয় প্রশাসন পাবলিক প্রপার্টি, খেলাধুলার মাঠ বা কমিউনিটি সেন্টার বিক্রি করতে শুরু করেছে। পিটারবরো সিটি কাউন্সিলও সেই একই পথ ধরেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের বক্তব্য, কেবল কে কত বেশি দাম দিল (হায়ার বিডার) তা দেখে চার দশকের পুরনো ধর্মীয় সংস্থাকে উচ্ছেদ করা নীতিগতভাবে ভুল। ভারত হিন্দু সমাজের দাবি, তারা নিজেরাও ন্যায্য দর হাঁকিয়েছিল কিন্তু কাউন্সিল তাদের প্রস্তাব 제대로 পর্যালোচনা না করেই অন্য সংস্থাকে সবুজ সংকেত দিয়ে দেয়। বিডের পয়েন্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে একাধিক গলদ ছিল এবং কাউন্সিল সদস্যরা পুরো রিপোর্ট না পড়েই সুপারিশে সই করে দেন বলে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে।
এখন যুক্তরাজ্যের হাইকোর্ট খতিয়ে দেখবে, এই বিক্রি প্রক্রিয়ায় সমতার নীতি এবং আইনি স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছিল কি না। আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ওপরই নির্ভর করছে পিটারবরোর হাজার হাজার প্রবাসী হিন্দুর একমাত্র প্রার্থনাস্থলের ভবিষ্যৎ।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
