‘লেবাননে যুদ্ধাপরাধের আশঙ্কা জাতিসংঘের!’: ইরান থেকে কূটনীতিক সরাল ব্রিটেন, ইসরায়েল ইস্যুতে সোচ্চার স্ট্রিটিং

‘লেবাননে যুদ্ধাপরাধের আশঙ্কা জাতিসংঘের!’: ইরান থেকে কূটনীতিক সরাল ব্রিটেন, ইসরায়েল ইস্যুতে সোচ্চার স্ট্রিটিং

লন্ডন, ২৪ জুলাই: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ চরম সীমানায় পৌঁছানোর মধ্যে লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ক্রমাগত হামলাকে সম্ভাব্য ‘যুদ্ধাপরাধ’ (War Crimes) হিসেবে চিহ্নিত করে কড়া হুঁশিয়ারি দিল জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক মানবধিকার লঙ্ঘন ও নির্বিচারে বিমান হামলার ফলে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ঠিক একই সময়ে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তার চরম আশঙ্কায় ইরান থেকে নিজেদের সমস্ত কূটনৈতিক কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। অন্যদিকে, ব্রিটেনের ক্যাবিনেট মন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার দাবিতে অনড় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের একটি দল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তৎপরতা ও জোরপূর্বক সাধারণ মানুষকে গৃহহীন করার কৌশল গাজার ভয়াবহ স্মৃতিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ৪,৩০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬২০ জন নারী ও শিশু রয়েছে।

জাতিসংঘের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, জনবহুল আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল এবং আশ্রয় শিবিরে যেভাবে বিমান হামলা ও নিষিদ্ধ শ্বেত ফসফরাস (White Phosphorus) ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে, তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মূল নীতি—‘পার্থক্য বজায় রাখা’ (Distinction) এবং ‘আনুপাতিকতা’ (Proportionality)—ঘোরতর লঙ্ঘন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এই ধরণের আক্রমণ যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি পদক্ষেপ এবং তার জবাবে ইরানের পাল্টা সামরিক প্রস্তুতির কারণে গোটা অঞ্চলে নজিরবিহীন বিমান হামলা ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তেহরানে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাস থেকে সমস্ত কূটনৈতিক কর্মীদের সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (FCDO)।

ব্রিটেন জানিয়েছে, “ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।” একই সাথে ব্রিটিশ নাগরিকদের ইরান, লেবানন ও আশেপাশের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ভ্রমণ না করার জন্য কড়া নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি আরও বড় ধরণের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

ইরান থেকে কূটনৈতিকদের ফিরিয়ে নিলেও, লেবানন ও গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের ভেতরেই সরব হয়েছেন নীতি নির্ধারকরা। যুক্তরাজ্যের শীর্ষ ক্যাবিনেট মন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং ইসরায়েলি সরকারের সামরিক নীতির কড়া সমালোচনা করে জানিয়েছেন, তিনি তাঁর বক্তব্যে অনড়।

স্ট্রিটিং জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো দেশের আত্মরক্ষার অধিকার থাকলেও আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন মেনে নেওয়া যায় না। বেসামরিক মানুষের আত্মত্যাগ ও খাদ্য-চিকিৎসার অভাব অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট কেবল দুটি বা তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সমগ্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর হুমকি সৃষ্টি করেছে। একদিকে লেবানন ও গাজায় মানবিক বিপর্যয়, অন্যদিকে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে সামরিক উত্তেজনার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মন্দার মেঘ জমছে। জাতিসংঘ এবং যুক্তরাজ্যের যৌথ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন কতটা আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে পারে এবং ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত সামাল দিতে পারে, সেদিকেই নজর রাখছে সমগ্র বিশ্ব।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply