নয়াদিল্লি, ২৪ জুলাই: আমেরিকার নতুন শুল্ক নীতিতে বড় কূটনৈতিক সাফল্য পেল ভারত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বিশ্বের ৬০টি দেশের ওপর শুল্ক পুনর্বিন্যাস করলেও, ভারতকে অপেক্ষাকৃত কম—অর্থাৎ ১০ শতাংশ শুল্কের ব্র্যাকেটে স্থান দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ওয়াশিংটন ভারতের ওপর ১২.৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করার পরিকল্পনা করেছিল। তবে দিল্লির দ্রুত নীতিগত পরিবর্তন এবং শ্রম আইন সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের পর এই শুল্কের হার কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন বাজারে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় স্বস্তি মিলবে বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা।
আমেরিকার ‘ট্রেড অ্যাক্ট অব ১৯৭৪’-এর ধারা ৩০১ (Section 301) অনুযায়ী মার্কিন ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (USTR) জ্যামিসন গ্রিয়ার ৬০টি দেশের ওপর এই নতুন শুল্ক কাঠামোর ঘোষণা দেন। মূলত বাধ্যতামূলক শ্রম বা জোরপূর্বক শ্রম (Forced Labour) প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে বিভিন্ন দেশের ওপর এই বাড়তি কর চাপানো হয়েছে। গত জুন মাসে যখন প্রথম এই প্রস্তাব পেশ করা হয়, তখন ভারত ছিল ১২.৫ শতাংশ শুল্কের তালিকায়।
তবে গত ১৪ জুন ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রক দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য নীতিতে (Foreign Trade Policy) তাৎপর্যপূর্ণ সংশোধন এনে বাধ্যতামূলক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। দিল্লির এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর ট্রাম্প প্রশাসন তাদের অবস্থান নমনীয় করতে বাধ্য হয়। ইউএসটিআর-এর তরফে জানানো হয়েছে, ভারতসহ যে ১৭টি দেশ বাধ্যতামূলক শ্রম রোধে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে। এই কম শুল্কের তালিকায় ভারতের পাশাপাশি রয়েছে ব্রিটেন, কানাডা, মেক্সিকো, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান।
অন্যদিকে, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি অর্থনীতির মতো ৪৩টি দেশ যাদের বাধ্যতামূলক শ্রম রোধে কঠোর আইন নেই, তাদের ওপর পুরো ১২.৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের মতো প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় ভারতীয় পণ্যের দাম কিছুটা হলেও প্রতিযোগিতামূলক থাকবে। মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, পেট্রোলিয়াম, সার, জরুরি খাদ্যপণ্য এবং যে সমস্ত কাঁচামাল আমেরিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় না, সেগুলোকে এই শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
প্রতি বছর ভারত থেকে আমেরিকায় বিপুল পরিমাণ টেক্সটাইল, গহনা, কেমিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য রপ্তানি হয়। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিগত বছরে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল প্রায় ১৪১ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ভারতের একক রপ্তানির পরিমাণই ছিল ৮৭.৩ বিলিয়ন ডলার।
নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক চালু হওয়ায় ভারতীয় রপ্তানিকারকদের ওপর কিছুটা বাড়তি করের চাপ তৈরি হলেও, সম্ভাব্য ১২.৫ শতাংশের তীব্র ধাক্কা থেকে বাঁচা গেছে। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের মতো প্রতিযোগী দেশের ওপর ১২.৫ শতাংশ শুল্ক থাকায় ভারতের ১০ শতাংশ ব্র্যাকেটে থাকা মার্কিন বাজারে ভারতীয় তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য এবং ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রীর চাহিদা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১২.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে শুল্ক নির্ধারণের ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে সামান্য শতাংশের হেরফের মনে হলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ওয়াশিংটন দিল্লির অর্থনৈতিক স্বার্থ ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক আলোচনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ভারত-আমেরিকা অর্থনৈতিক সহযোগিতার গতি বজায় রাখতেই মার্কিন প্রশাসন এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেছে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
