বারুইপুর, ৬ জুলাই ২০২৬: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক ১১ বছরের নিখোঁজ নাবালিকার বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে গতকাল রবিবার দিনভর নজিরবিহীন রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় সমগ্র এলাকা। নাবালিকাটিকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। এই নারকীয় ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। ক্ষুব্ধ জনতা মৃতদেহ রাস্তায় রেখে দীর্ঘক্ষণ পথ ও রেল অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে উত্তেজিত জনতার রোষের মুখে পড়তে হয় পুলিশকে। পুলিশের একাধিক গাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি, মূল অভিযুক্ত সন্দেহে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে খুন করারও অভিযোগ উঠেছে। আজ সোমবারও এলাকায় চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মোতায়েন রয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বারো বছর বয়সী ওই নাবালিকাটি গত শনিবার (৪ জুলাই) বিকেল থেকে নিখোঁজ ছিল। পরিবারের লোকেরা রাতভর খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পায়নি। এরপর গতকাল রবিবার সকালে গ্রামেরই একটি পুকুরে তার বস্তাবন্দি নিথর দেহ ভাসতে দেখা যায়। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে সুর্যপুর গ্রাম। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের অভিযোগ, এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি নাবালিকাটিকে অপহরণ করে ধর্ষণ ও খুন করেছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে নাবালিকার দেহ রাস্তার মাঝখানে রেখে এবং শিয়ালদহ-নামখানা শাখার রেললাইন অবরুদ্ধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে উত্তেজিত জনতা।
উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে স্থানীয় বাসিন্দারা সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটকে করে। তার মধ্যে এক ব্যক্তিকে মূল অভিযুক্ত সন্দেহে উত্তেজিত জনতা নির্মমভাবে গণপিটুনি দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এদিকে, দুপুরের দিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে বারুইপুর থানার পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাদের ওপর চড়াও হয় বিক্ষুব্ধ জনতা। পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ইটবৃষ্টি করা হয়। দফায় দফায় চলা এই সংঘর্ষে পুলিশের বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। উত্তেজিত জনতার হামলায় একাধিক পুলিশ কর্মী গুরুতর জখম হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ায় বিশাল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী নামাতে বাধ্য হয় প্রশাসন।
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের আইজি কঙ্কনপ্রসাদ বারুই। তিনি হ্যান্ডমাইক হাতে নিয়ে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত হওয়ার এবং আইন নিজের হাতে না নেওয়ার জন্য বারবার আবেদন জানান।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আইজি কঙ্কনপ্রসাদ বারুই বলেন, “গতকালকের এই নৃশংস ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। পুলিশ আইনানুযায়ী সবরকম কঠোর পদক্ষেপ করছে। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করা শুরু হয়েছে এবং আমরা আদালতে দোষীদের ফাঁসির সাজা নিশ্চিত করার দাবি জানাব। কিছু সময় আগেই মুখ্যমন্ত্রী নিজে ফোন করে আশ্বস্ত করেছেন যে, দোষীদের কাউকেই কোনোভাবে ছাড় দেওয়া হবে না। আপনারা প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করুন।”
আজ সোমবার সকাল থেকেও বারুইপুরের ধপধপি ও সুর্যপুর সংলগ্ন এলাকায় থমথমে ভাব বজায় রয়েছে। দোকানপাট অধিকাংশ বন্ধ। ঘটনার তদন্তের জন্য ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে। পুলিশ সুত্রে খবর, নাবালিকা খুনের ঘটনায় ইতিমধ্যেই প্রভাস মণ্ডল নামের এক ব্যক্তিসহ দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি, গণপিটুনি ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পৃথক আরেকটি এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে গোটা এলাকায় র্যাফ (RAF) এবং বিশাল পুলিশ বাহিনী টহল দিচ্ছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

