বারুইপুর, ৫ জুলাই: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর পুলিশ জেলার অন্তর্গত ধপধপি-২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের সূর্যপুর হাট এলাকা রবিবার সকালে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ রণক্ষেত্রের রূপ ধারণ করল। শনিবার বিকেল থেকে নিখোঁজ থাকা ১১ বছরের এক স্কুলছাত্রীর বস্তাবন্দি ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। নাবালিকাটিকে পাশবিকভাবে গণধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পৈশাচিকতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই উত্তেজিত জনতা মৃতদেহ রাস্তায় রেখে বিক্ষোভ শুরু করে, পুলিশের একাধিক গাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে এবং রেল ও সড়ক পথ অবরোধ করে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। উত্তেজিত জনতার ইটের আঘাতে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মী গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এরই মধ্যে, ধর্ষণের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত সন্দেহে ইন্দ্রজিৎ তাঁতি (২৬) নামের এক যুবককে উন্মত্ত জনতা পিটিয়ে হত্যা করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বারুইপুর পুলিশ জেলা ছাড়াও ক্যানিং, সোনারপুর ও জয়নগর থেকে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী তলব করা হয়।
স্থানীয় এবং ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ষষ্ঠ শ্রেণীর ওই ছাত্রীটি শনিবার বিকেল আনুমানিক চারটে নাগাদ বাড়ি থেকে সামান্য কিছু খাবার বা বন্ধুর জন্মদিনের উপহার কেনার কথা বলে বের হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সে বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা গভীর উদ্বেগের সাথে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। রাতভর সমস্ত সম্ভাব্য স্থানে তল্লাশি চালিয়েও মেয়েটির কোনো হদিস মেলেনি। রবিবার ভোরবেলা সূর্যপুর হাট এলাকার রেললাইনের পাশের একটি পুকুরে চটের বস্তা ভাসতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বস্তাটি জল থেকে টেনে তোলার পর তার ভেতর থেকে নিখোঁজ নাবালিকার বিবস্ত্র ও রক্তাক্ত নিথর দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের অভিযোগ, চারজন দুষ্কৃতী মিলে মেয়েটিকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে তার শ্বাসরোধ করে হত্যা করে চটের বস্তায় বন্দি করে পুকুরে ফেলে দিয়ে যায়।
নাবালিকার বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধারের খবর চাউর হতেই সূর্যপুর হাটে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা অবিলম্বে সমস্ত অপরাধীদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে মৃতদেহ রাস্তায় রেখে পথ অবরোধ শুরু করেন। উত্তেজিত জনতা শিয়ালদহ-নামখানা দক্ষিণ শাখার সূর্যপুর রেল স্টেশনে রেললাইনে বসে পড়ে অবরোধ শুরু করে, যার জেরে ডাউন ও আপ লাইনে ট্রেন চলাচল প্রায় এক ঘণ্টার জন্য সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। সড়ক পথও প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকে। বারুইপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে উত্তেজিত জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে তীব্র ইটবৃষ্টি শুরু করে। রণোন্মত্ত জনতা পুলিশের গাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। উত্তেজিত জনতার আক্রমণে এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-সহ বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মী রক্তাক্ত হন, যাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার এই চরম মুহূর্তে ক্ষুব্ধ জনতা বিকল্প বিচারের পথ বেছে নেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, প্রথম দিকে গ্রামবাসীরা কয়েকজন সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করে পুলিশের হাতে তুলে দিলেও এক স্থানীয় প্রভাবশালী নেতার মদতে পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আগুনে ঘি পড়ে রবিবার সকালে। ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা গ্রামবাসীরা ইন্দ্রজিৎ তাঁতি (কারও কারও মতে ইন্দ্র তাঁতি, ২৪) নামে এক যুবককে অপরাধীদের সহযোগী সন্দেহে আটকে রেখে বেধড়ক মারধর শুরু করে। পুলিশ তাকে উদ্ধার করতে গেলে পুলিশের ওপরও চড়াও হয় উন্মত্ত জনতা। গুরুতর আশঙ্কাজনক অবস্থায় ইন্দ্রজিৎকে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, নাবালিকা খুনের পাশাপাশি এই গণপিটুনির ঘটনার জন্যও একটি পৃথক খুনের মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা খতিয়ে দেখতে এবং বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করতে বিশাল বাহিনী নিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছান প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের আইজি কঙ্কনপ্রসাদ বারুই। তিনি এলাকায় পুলিশি টহলদারির ব্যবস্থা করেন এবং মেগাফোনের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন:
“কালকে যে ঘটনা ঘটেছে, আমরা তাতে মর্মাহত। এবং এই কেসের সঙ্গে যারা যারা জড়িত প্রত্যেকে গ্রেফতার হবে। আমরা ফাঁসির সাজা দেব। একটু আগে আমাদের, মুখ্যমন্ত্রী ফোন করেছিলেন। কথা বলেছেন সরাসরি। উনি কথা দিয়েছেন, এই ঘটনার সঙ্গে যারা যারা জড়িত, কাউকে ছাড়া হবে না। এবং আপনাদের আমি কথা দিয়ে যাচ্ছি, এর বিরুদ্ধে যা যা ব্যবস্থা গ্রহণ করার আমরা গ্রহণ করব। …সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করুন। আমরা আপনাদের সঙ্গে সবসময় আছি।”
পুলিশ ইতিমধ্যেই এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে গ্রেফতার করেছে। ঘটনার দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করতে এবং সমস্ত আসামিদের চিহ্নিত করতে বারুইপুর জেলা পুলিশের অ্যাডিশনাল এসপি (Addl. SP)-এর নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘটনার দিনই মৃতার বাবার সাথে সরাসরি দূরভাষে কথা বলেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা ও ফাঁসির সাজার দাবি জানানোর প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারটিকে আগামী মঙ্গলবার রাজ্য সচিবালয় নবান্নে এসে তাঁর সাথে দেখা করার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের মে মাসে ঘটে যাওয়া শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের পর গঠিত নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা নিয়ে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে জোরদার রাজনৈতিক চাপানউতোর। প্রধান বিরোধী দল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে রাজ্যের নারী নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ অভিযোগ করেছেন যে, পুলিশি ব্যর্থতার কারণেই এক অপরাধী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। একই সাথে তিনি দাবি করেন, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বারুইপুর যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় তাঁর কালীঘাটের বাসভবনের সামনে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও ব্যারিকেড মোতায়েন করে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। অন্যদিকে বামপন্থী যুব ও ছাত্র সংগঠন ডিওয়াইএফআই (DYFI) এবং এআইডিএসও (AIDSO) এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আগামী ৬ ও ৭ জুলাই রাজ্যজুড়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে।
আপাতত সূর্যপুর হাট এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির ওপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
