অযোধ্যার রাম মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া কোটি কোটি টাকার অনুদান ও নগদ অর্থ চুরির মারাত্মক অভিযোগের আবহেই এক বড় রাজনৈতিক এবং আইনি বিতর্ক দানা বেঁধেছে। এই আবহে শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ট্রাস্টটিকে তথ্য জানার অধিকার বা আরটিআই (Right to Information – RTI) আইনের আওতায় আনার জন্য জোরালো দাবি উঠেছে। কেরলের সিপিআই(এম) (CPI(M)) সাংসদ এবং রাজ্যসভায় দলের সংসদীয় নেতা জন ব্রিটাস এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউজ মিনিট’ (The News Minute – TNM)-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৪ জুলাই (শনিবার) পাঠানো এই চিঠিতে সাংসদ জন ব্রিটাস ট্রাস্টটির বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বর্তমান অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আর্জি জানিয়েছেন। হাইকোর্টে সরকারের পূর্ববর্তী অবস্থানের পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি সংশোধিত অবস্থান পেশ করার অনুরোধ করেছেন তিনি, যাতে আদালত এই ট্রাস্টের জবাবদিহির বিষয়টি আইনি ও সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারে।
অযোধ্যার রাম মন্দিরে ভক্তদের দান করা কোটি কোটি টাকার নগদ অর্থ আত্মসাৎ ও চুরির ঘটনার অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই এই বিতর্কের সূত্রপাত। এই দুর্নীতির অভিযোগ এতটাই গুরুতর রূপ নেয় যে উত্তরপ্রদেশ সরকার ঘটনার তদন্তে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করতে বাধ্য হয় এবং ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনার পরেই রাম মন্দির পরিচালনাকারী সংস্থা ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
জন ব্রিটাসের চিঠির মূল যুক্তি ও বক্তব্য
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে লেখা চিঠিতে জন ব্রিটাস ট্রাস্টের আইনি কাঠামো এবং সরকারের সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মূল যুক্তিগুলি নিচে দেওয়া হলো:
১. সরকারি পদক্ষেপের মাধ্যমে গঠন: জন ব্রিটাস প্রশ্ন তুলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার অনুমোদিত একটি প্রকল্পের (Scheme) মাধ্যমে যে ট্রাস্ট গঠিত হয়েছে এবং যাকে সরকার নিজেই জমি ও সম্পত্তি হস্তান্তর করেছে, তাকে কীভাবে আরটিআই-এর মতো জন-জবাবদিহির কাঠামোর বাইরে রাখা যেতে পারে?
২. আইনি ভিত্তি ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ: চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার এই ট্রাস্টের পরিচালনা কাঠামো তৈরি করেছে, সরকারি গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ১৯৯৩ সালের অযোধ্যা আইন (Acquisition of Certain Area at Ayodhya Act, 1993) অনুযায়ী অধিগ্রহণ করা জমি ট্রাস্টের হাতে তুলে দিয়েছে। এছাড়া ট্রাস্টের প্রাথমিক ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ১২ জনকেই সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকার মনোনীত করেছিল। ফলে এই ট্রাস্টের আইনি অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে সরকারি আইনি পদক্ষেপের সাথে যুক্ত।
৩. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বৈপরীত্য: ব্রিটাস মনে করিয়ে দেন যে, আইনি প্রক্রিয়াজুড়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক নিজেই স্বীকার করে এসেছে যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনেই সরকার এই ট্রাস্ট গঠন করেছে এবং সরকারই এর মূল প্রতিষ্ঠাতা (Settlor)। এই মৌলিক সত্যটি স্বীকার করার পর সরকার কীভাবে দাবি করতে পারে যে, আরটিআই আইনের ধারা ২(এইচ) (Section 2(h)) অনুযায়ী এই ট্রাস্ট সরকার দ্বারা গঠিত কোনো ‘পাবলিক অথরিটি’ বা জন-কর্তৃপক্ষ নয়?
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ (পূর্বতন টুইটার) নিজের চিঠির অংশ শেয়ার করে সাংসদ জন ব্রিটাস তীব্র সমালোচনা করে লেখেন:
“মোদী সরকার দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতে পারে না। তারা সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট গঠন করল, সংসদের আইনের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা জমি হস্তান্তর করল, কর্মরত আইএএস (IAS) অফিসারদের সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ডে মনোনীত করল, অথচ এখন দাবি করছে যে এতে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই এবং ট্রাস্টটি আরটিআই আইনের আওতার বাইরে! সরকার কোনো ট্রাস্টকে কেবল ‘স্বায়ত্তশাসিত’ তকমা দিয়ে দিলেই স্বচ্ছতাকে বলি দেওয়া যায় না।”
সিপিআই(এম) সাংসদ তাঁর চিঠিতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আরটিআই আইন কার্যকর হলে ট্রাস্টের ধর্মীয় স্বাধীনতায় কোনো হস্তক্ষেপ হবে না। এটি কেবল ট্রাস্টের প্রশাসনিক ও আর্থিক দিক যেমন— তহবিল পরিচালনা, সরকারি-বেসরকারি চুক্তি এবং ভক্তদের থেকে পাওয়া দানের অর্থের ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এই প্রসঙ্গে তিনি ‘শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী শ্রাইন বোর্ড’-এর (Shri Mata Vaishno Devi Shrine Board) উদাহরণ টেনে বলেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা পুরোপুরি সম্ভব।
রাম জন্মভূমি ট্রাস্টের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে কেবল সিপিআই(এম)-ই নয়, সরব হয়েছে অন্যান্য বামপন্থী দলও। ‘দ্য নিউজ মিনিট’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, এর আগে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI)-র রাজ্যসভার সাংসদ পি সন্দোষ কুমারও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লিখেছিলেন। তিনি এই ট্রাস্টের সমস্ত আর্থিক লেনদেনের ওপর ভারতের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (CAG) দ্বারা একটি ব্যাপক অডিট (Audit) এবং সম্পূর্ণ ঘটনার একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
ভক্তদের আস্থার অবমাননা রোধ করতে এবং কোটি কোটি টাকার অনুদানের সঠিক হিসাব দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতেই রাম জন্মভূমি ট্রাস্টকে তথ্য জানার অধিকারের (RTI) আওতায় আনার এই জোরালো দাবি বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

