নয়াদিল্লি, ১৬ জুলাই: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক অস্ট্রেলিয়া সফরকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অলিন্দে শুরু হয়েছে তীব্র বাকযুদ্ধ। এই হাই-প্রোফাইল সফর নিয়ে শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকে সাফল্যের প্রভূত দাবি করা হলেও, বিরোধী দল কংগ্রেস বিষয়টিকে একেবারেই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা পবন খেরা প্রধানমন্ত্রীর এই সফর এবং তা নিয়ে প্রচারের বহরকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কড়া এবং ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় আক্রমণ শাণিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদীকে খোঁচা দিয়ে তিনি সরাসরি ‘ডঙ্কাপতি জি’ বা নিজের সাফল্যের ঢোল নিজে পেটানো ব্যক্তি বলে অভিহিত করেছেন, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনৈতিক মহলে তুমুল চর্চা এবং বাদানুবাদ শুরু হয়েছে। এই সফরের আসল প্রভাব কতটা, তা নিয়েই এখন বিরোধীরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
কংগ্রেস নেতা পবন খেরা তাঁর এই ব্যঙ্গাত্মক দাবির সপক্ষে একটি বিশেষ ভিডিও কোলাজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। মূলত গত ৮ থেকে ১০ জুলাই, ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অস্ট্রেলিয়া সফরের বিভিন্ন মুহূর্তকে একত্রিত করে এই ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে। ভিডিওটিতে স্থান পেয়েছে মেলবোর্ন শহরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিক স্বাগত সম্ভাষণ, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং একটি বিশাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আয়োজিত বিশেষ গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠান। ভিডিওর দৃশ্যগুলোতে দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি অনুষ্ঠানেই প্রচারের আলো কীভাবে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের ওপর বজায় ছিল। তবে পবন খেরা এই ভিডিওটির মাধ্যমে মূল যে বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই সফরকে যতটা গম্ভীর এবং ঐতিহাসিক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার মূল ধারার সংবাদমাধ্যম বিষয়টিকে ততটা গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি, বরং তাদের উপস্থাপনা ছিল বেশ কিছুটা আলাদা।
শেয়ার করা ভিডিওটির সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত অংশটি হলো অস্ট্রেলিয়ার একটি টেলিভিশন চ্যানেলেন নিউজ স্টুডিওর দৃশ্য। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ যখন একটি দ্বিপাক্ষিক অনুষ্ঠানে যৌথভাবে একে অপরের হাত তুলে দর্শকদের উদ্দেশ্যে নাড়ছিলেন, তখন সেই দৃশ্য দেখে স্টুডিওতে উপস্থিত অজি নিউজ হোস্ট বা সঞ্চালকেরা হাসাহাসি শুরু করেন। শুধু সামান্য হাসাহাসিই নয়, লাইভ নিউজ বুলেটিন চলার মাঝেই সেই সঞ্চালকেরা দুই নেতার হাত তোলার ভঙ্গিটি অবিকল নকল বা অনুকরণ করে দর্শকদের দেখান। পবন খেরা এই নির্দিষ্ট অংশটিকে বিশেষভাবে হাইলাইট করে দেখাতে চেয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই প্রচারমুখী আচরণকে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম কতটা হালকা এবং কৌতুকপূর্ণ মেজাজে গ্রহণ করেছে। তাঁর মতে, এটি দেশের কূটনৈতিক সফলতার চেয়েও বেশি আন্তর্জাতিক স্তরে বিনোদনের উপাদানে পরিণত হয়েছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
কূটনৈতিক স্তরে অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর এই তিন দিনের অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ফলাফল এবং চুক্তি উঠে এসেছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই হাই-প্রোফাইল সফরে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক আদানপ্রদান আরও গতিশীল করতে বিশেষ অর্থনৈতিক চুক্তি এবং খেলাধুলার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পার্টনারশিপের অংশ হিসেবে একটি বড় মাপের ক্রীড়া সহযোগিতা রোডম্যাপ বা রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তবে কংগ্রেস এবং পবন খেরার মূল নিশানা ছিল এই সফরের কূটনৈতিক অর্জনের চেয়েও এর পেছনে থাকা বিশাল প্রচার কৌশলের ওপর। খেরার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকে এটি স্পষ্ট যে, তিনি অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমের এই লঘু ও মজাদার কভারেজকে প্রধান হাতিয়ার করে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের প্রকৃত প্রভাব এবং গুরুত্বের ওপর বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করতে চেয়েছেন। তাঁদের দাবি, যেখানে দেশের মানুষের মূল ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারের বেশি নজর দেওয়া দরকার, সেখানে কেবল আন্তর্জাতিক স্তরে প্রচার পাওয়ার এই আগ্রাসী চেষ্টা কতটা ফলপ্রসূ, তা অজি মিডিয়ার এই প্রতিক্রিয়াই স্পষ্ট করে দেয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক তরজা আগামী দিনে আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

