নয়াদিল্লি, ২৬ জুলাই: ভারতীয় বিমানবন্দর পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব দ্রুত বিস্তার করলেও এখনই নিজস্ব বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা বা ‘এয়ারলাইন’ চালু করার কোনো ইচ্ছা নেই বললেই চলে— স্পষ্ট জানাল আদানি গোষ্ঠী (Adani Group)। সম্প্রতি প্রকাশিত স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়ার’ (The Wire)-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানবন্দর পরিচালনা এবং বিমান সংস্থার মালিকানা সংক্রান্ত বিদ্যমান সরকারি নিয়মে কিছু শিথিলতা চেয়েছে এই শিল্প সংস্থা। কেন্দ্র সরকারের কাছে নিয়মের কিছু পরিবর্তনের আর্জি জানানো হলেও, ব্যবসায়িক স্তরে নিজস্ব বিমান পরিষেবা শুরু করার খবরটিকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে উড়িয়ে দিয়েছে আদানি গ্রুপ।
‘দ্য ওয়ার’-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, ভারতের অসামরিক বিমান চলাচল নীতি অনুসারে বিমানবন্দর পরিচালনাকারী কোনো সংস্থা সরাসরি কোনো এয়ারলাইনস বা বিমান সংস্থায় বড় শেয়ার বা মালিকানা রাখতে পারে না, যাতে বাজারে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি না হয়। কিন্তু বর্তমানে আদানি গোষ্ঠী আহমেদাবাদ, লখনউ, জয়পুর, গুয়াহাটি, তিরুবনন্তপুরম, মঙ্গলুরু এবং মুম্বইয়ের মতো দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক বিমানবন্দর পরিচালনা করছে। এই পরিস্থিতিতে নিয়ম শিথিলকরণের আর্জি নতুন করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রকের অন্দরে চর্চা শুরু করেছে।
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়ার’-এর বিশদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বর্তমান সিভিল এভিয়েশন গাইডলাইনস অনুযায়ী, বিমানবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান (Airport Operator) এবং বিমান পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার (Airline Operator) মধ্যে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) এড়াতে মালিকানার ওপর নির্দিষ্ট আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে। যদি একটি সংস্থাই বিমানবন্দর এবং সেখানে ওঠানামা করা বিমান উভয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করে, তবে তা প্রতিযোগিতামূলক বাজারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
আদানি গ্রুপের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বিমানবন্দর পরিকাঠামো উন্নয়ন, যাত্রী পরিষেবা বৃদ্ধি এবং কার্গো পরিবহনের আধুনিকীকরণই বর্তমানে তাঁদের মূল অগ্রাধিকার। নিজস্ব এয়ারলাইন খোলার বিষয়ে যে সমস্ত জল্পনা তৈরি হয়েছিল, সেগুলিকে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়ে গ্রুপটি জানিয়েছে, নীতিমালার শিথিলতা চাওয়ার উদ্দেশ্য কেবল পরিকাঠামোগত বিনিয়োগ ও পরিচালনাকে আরও সহজ ও আন্তর্জাতিক মানের করে তোলা, কোনো বিমান সংস্থাকে কিনে নেওয়া বা নতুন বিমান সংস্থা তৈরি করা নয়।
অসামরিক বিমান চলাচল খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রক (MoCA)-এর কাছে আদানি গ্রুপের এই প্রস্তাব পেশের পর থেকেই ওয়াকিবহাল মহল ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। ‘দ্য ওয়ার’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের বিমানবন্দর পরিকাঠামোয় আদানির মতো বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থার উপস্থিতি ইতিমধ্যেই বেশ স্পষ্ট। এখন যদি বিমান সংস্থা ও বিমানবন্দর পরিচালনার নিয়মে ছাড় দেওয়া হয়, তবে এভিয়েশন সেক্টরে মুক্ত প্রতিযোগিতা ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কাপ্রকাশ করেছেন খাতের বেশ কিছু স্বাধীন বিশ্লেষক।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিমান চলাচলের বর্তমান বিধিনিষেধ শিথিল করা হলে তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগের (Joint Venture) জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে সত্য, তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের বিমান সংস্থাগুলির জন্য বাজারে টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। আদানি গোষ্ঠী অবশ্য স্পষ্ট করেছে যে, তারা দেশের প্রতিটি বিমানবন্দরে অবকাঠামোগত মান বৃদ্ধি করতে এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলিকে উন্নত পরিষেবা দিতেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বর্তমানে দেশের অসামরিক বিমান পরিবহন ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে আদানি অ্যাভিয়েশন। মুম্বইয়ের নতুন নভি মুম্বই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (NMIAL) তৈরির দায়িত্বেও রয়েছে তারা। ফলে এয়ারলাইন চালানোর কোনো সরাসরি পরিকল্পনা না থাকলেও, দেশের প্রধান প্রধান বিমানবন্দরগুলির পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের রাশ নিজেদের হাতে রেখে ভারতীয় বিমান পরিবহন ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করতে চাইছে আদানি গোষ্ঠী। ‘দ্য ওয়ার’-এর তথ্য অনুযায়ী, সরকার এই নীতি শিথিল করার বিষয়ে চূড়ান্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়, এখন সে দিকেই কড়া নজর রাখছে পুরো এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
