আমেদাবাদের এক প্রকৌশলী বানিয়েছিলেন জুলাই সহিংসতার তথ্যাভিধান, তার পরেই বাড়িতে হাজির গুজরাট পুলিশ

আমেদাবাদের এক প্রকৌশলী বানিয়েছিলেন জুলাই সহিংসতার তথ্যাভিধান, তার পরেই বাড়িতে হাজির গুজরাট পুলিশ

আমেদাবাদ, ২৬ জুলাই: গুজরাটের হিংসাত্মক ঘটনার নথিবদ্ধকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার অপরাধেই কি বলপ্রয়োগের মুখোমুখি হতে হলো এক তরুণ প্রকৌশলীকে? আমেদাবাদের এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের তৈরি বিশেষ ওয়েবসাইটের ওপর গুজরাট পুলিশের সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে চরম উদ্বেগ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়ার’ (The Wire)-এর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা। জুলাইয়ের সহিংসতা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং প্রামাণ্য নথি সংগ্রহের লক্ষ্যে ওয়েবসাইটটি তৈরি করার কয়েকদিনের মধ্যেই ওই প্রকৌশলীর বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ প্রশাসন।

‘দ্য ওয়ার’-এর বিশদ প্রতিবেদনে প্রকাশ, পেশায় সফটওয়্যার প্রকৌশলী ওই তরুণ আমেদাবাদের জুলাই মাসের গোষ্ঠীগত ও রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় ঘটে যাওয়া নানা অপ্রীতিকর ঘটনা, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের বক্তব্য ডিজিটাল মাধ্যমে নথিবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিরপেক্ষভাবে একটি অনলাইন ‘ডিজিটাল রেকর্ড’ বা তথ্যাভিধান গড়ে তোলাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য। তবে ওয়েবসাইটটি প্রকাশ্যে আসার পরই আমেদাবাদ পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ ও স্থানীয় পুলিশ সাইবার নজরদারির মাধ্যমে তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর বাসভবনে অভিযান চালায়।

‘দ্য ওয়ার’-এর হাতে আসা তথ্য অনুসারে, ওই প্রকৌশলী ডিজিটাল কোডিং ও ডেটা অ্যানালিটিক্সের নিজস্ব কৌশল ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, স্থানীয় খবরের নথি এবং আক্রান্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে তথ্য একত্রিত করছিলেন। মূল উদ্দেশ্যে ছিল সংবেদনশীল ঘটনার সঠিক চিত্র তুলে ধরা এবং বিচারবিভাগীয় তদন্তের ক্ষেত্রে প্রামাণ্য তথ্য সরবরাহ করা। কিন্তু পুলিশের দাবি, এ ধরণের প্ল্যাটফর্ম বা ওয়েবসাইট নাকি জনমানসে বিভ্রান্তি ও হিংসা উস্কে দিতে পারে।

প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, পুলিশের টিম ওই তরুণ প্রকৌশলীর বাড়িতে পৌঁছে তাঁর কম্পিউটার, হার্ড ড্রাইভ, মোবাইল ফোন সহ একাধিক ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বাজেয়াপ্ত বা পরীক্ষা করে। কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত নোটিশ ছাড়াই তাঁকে কয়েক ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং সাইটটি অবিলম্বে ইন্টারনেট থেকে মুছে ফেলার জন্য পরোক্ষ মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। সাধারণ নাগরিকদের ওপর পুলিশের এমন তৎপরতা ও নজরদারি গণতান্ত্রিক উপায়ে তথ্য অধিকার চর্চার ওপর এক বিরাট আঘাত বলে মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।

এই ঘটনা সামনে আসার পর রাজ্যের নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার কর্মী এবং অনলাইন ফ্রিডম অ্যাক্টিভিস্টরা একযোগে সোচ্চার হয়েছেন। ‘দ্য ওয়ার’-এর প্রতিবেদনে মানবাধিকার রক্ষা সংগঠনগুলির বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, কোনো নাগরিক যদি প্রকাশ্যে ঘটে যাওয়া সহিংসতার তথ্য নথিবদ্ধ করেন, তবে তা কোনো ফৌজদারি অপরাধের সামিল হতে পারে না। ইতিহাস বা সত্য তথ্য মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে পুলিশি ক্ষমতা ব্যবহার করাকে এক প্রকার ‘ডিজিটাল সেন্সরশিপ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তাঁরা।

অন্যদিকে, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, যে কোনো স্পর্শকাতর ঘটনার সময় অসত্য তথ্য বা উস্কানিমূলক বার্তা ছড়ানো বন্ধ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে ওই প্রকৌশলী কোনো উস্কানিমূলক মন্তব্য প্রকাশ করেননি, বরং কেবল তথ্য সংগ্রহ করছিলেন— যা পুলিশের দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

প্রকৌশলীর ওপর পুলিশি হয়রানির এই খবর চাউর হতেই রাজ্যের পাশাপাশি জাতীয় স্তরেও বাকস্বাধীনতা ও ইন্টারনেটের স্বাধীনতার ওপর খড়্গহস্ত হওয়ার নীতি নিয়ে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন সমাজকর্মীদের দমন করার যে ধারা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, এই ঘটনা তারই আরেক নিদর্শন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

‘দ্য ওয়ার’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গুজরাটের এই ঘটনা প্রমাণ করে কীভাবে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সত্য ও নিরপেক্ষ রিপোর্ট তুলে ধরার প্রচেষ্টাকেও প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে রুখে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আদালতের হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ওই প্রকৌশলীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাইবার সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই দানা বাঁধার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

ওয়েবসাইট এর লিঙ্ক The Unbadged: they removed the badges; the record remains

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply