নয়াদিল্লি, ২৬ জুলাই: ভারতে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আদর্শগত, নীতিগত ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS)-এর দীর্ঘকালীন মূল অ্যাজেন্ডাগুলির অন্যতম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের রদবদল এবং ধর্মেন্দ্র প্রধানকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা সঙ্ঘের এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত ব্যাকফুটে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিখ্যাত স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়ার’ (The Wire)-এর প্রকাশিত এক বিশদ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) বাস্তবায়ন এবং দেশের শীর্ষ স্থানীয় কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে সঙ্ঘের নিজস্ব প্রভাব বিস্তারের সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ায় শিক্ষা মন্ত্রকের এই প্রশাসনিক রদবদল আরএসএস-এর জন্য একটি বড়সড় বিপর্যয় তৈরি করল।

‘দ্য ওয়ার’-এর বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারতের শিক্ষা খাত সর্বদা নাগপুরের আরএসএস সদর দপ্তরের জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রগুলির পাঠ্যক্রম সংস্কার করা, নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দর্শনের আলোকে ইতিহাসের পুনর্লিখন এবং দেশের বিশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিজেদের অনুগত ও ভাবধারার ব্যক্তিদের উচ্চপদে বসানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক প্রভাব বিস্তার করাই সঙ্ঘের আসল উদ্দেশ্য। ধর্মেন্দ্র প্রধানের কার্যকালে আরএসএস তাদের চিন্তাভাবনা, নীতি ও বিভিন্ন এজেন্ডা শিক্ষা মন্ত্রকের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজ ও নিরঙ্কুশভাবে চালনা করার অভূতপূর্ব সুযোগ পাচ্ছিল। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকে প্রধানের বিদায় এবং আকস্মিক প্রশাসনিক রদবদল সঙ্ঘ নেতৃত্বের জন্য এক অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা তৈরি করেছে।
‘দ্য ওয়ার’-এর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ অনুসারে, আরএসএস ভারতের বিদ্যমান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে নিজেদের মতো করে পুনর্গঠন করতে শিক্ষাকেই সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্থায়ী মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর গবেষণার স্তর পর্যন্ত নিজেদের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবেশ করানোর পরিকল্পনাটি তাঁদের শতবর্ষী মিশনেরই একটি অংশ। বিতর্কিত জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020) প্রণয়ন এবং তা তড়িঘড়ি করে দেশে কার্যকর করার পেছনে সঙ্ঘের একাধিক পরামর্শক সংস্থা, শিক্ষা সংস্কৃতি উত্থান ন্যাস ও অনুগামী চিন্তাবিদদের সরাসরি অবদান ছিল।
দেশের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে উপাচার্য (VC) নিয়োগ থেকে শুরু করে ভারতীয় ইতিহাস গবেষণা পরিষদ (ICHR) বা আইসিএসএসআর (ICSSR)-এর মতো নীতি-নির্ধারক পদের শীর্ষ প্রধান নির্বাচন— সব ক্ষেত্রেই নাগপুরের সবুজ সংকেত একপ্রকার অদৃশ্য নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু প্রধানের বিদায় এবং শিক্ষা দপ্তরে প্রশাসনিক স্তরে নতুন রদবদলের ফলে নীতি নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের এই অবাধ গতি থমকে যেতে পারে বলে তীব্র আশঙ্কায় রয়েছে সঙ্ঘঘনিষ্ঠ মহল।
নিট (NEET-UG) ও অন্যান্য জাতীয় স্তরের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক সময় জুড়ে দেশজোড়া অভূতপূর্ব বিতর্ক, প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-র চরম গাফিলতি ও দুর্নীতির দরুণ শিক্ষা মন্ত্রক দেশের ছাত্রসমাজ, অভিভাবক ও আদালতের কাছে মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছিল। দিল্লি থেকে বিহার— দেশজুড়ে লাখ লাখ ভুক্তভোগী ছাত্র-যুবদের তীব্র ক্ষোভ এবং রাজপথে টানা আন্দোলনের ফলে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার চরম অস্বস্তিতে পড়ে। শিক্ষা ক্ষেত্রের এই প্রশাসনিক ধস, ক্রমাগত প্রশ্নফাঁসের দায়ে জর্জরিত হয়ে পড়া এবং পরিচালনাগত চরম ব্যর্থতার দায়ভার শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধানের ওপর এসে পড়ে।
‘দ্য ওয়ার’-এর প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, নিট কাণ্ড সামলাতে কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপ প্রকৃতপক্ষে সঙ্ঘের সাথে প্রশাসনিক ক্ষমতার টানাটানির এক প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। কেন্দ্র যেখানে ক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজকে সামাল দিতে এবং নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে মন্ত্রী বদল করতে বাধ্য হলো, সেখানে এর সরাসরি মাশুল গুনতে হলো আরএসএস-কে। কারণ, শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সঙ্ঘের যে প্রত্যক্ষ ও নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব গড়ে উঠেছিল, নতুন এই রদবদলের দরুণ তাতে বড়সড় ছেদ পড়ল। নতুন প্রশাসনিক নেতৃত্বের সাথে নাগপুরের সেই পুরোনো সুসমন্বয় ফের নতুন করে তৈরি হতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে, যা বিরোধীদের আক্রমণের মুখে সঙ্ঘের শিক্ষা নীতিকে ডিফেন্সিভ মোডে ঠেলে দিয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব শিথিল হওয়ার এই ঘটনা কেন্দ্র এবং সঙ্ঘ নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নিয়েও নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক উস্কে দিল। নীতিগত বিষয়ে সঙ্ঘের নির্দেশ বা পরামর্শকে প্রাধান্য দেওয়ার যে অলিখিত ঐতিহ্য বিজেপির রাজনীতিতে এতদিন বজায় ছিল, প্রশাসনিক সংকট ও ছাত্র বিক্ষোভের মুখ রক্ষা করতে কেন্দ্র এখন যে নিজেদের মতো করে একক সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হচ্ছে না, প্রধানের অপসারণের এই ঘটনা তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
সামগ্রিকভাবে, ‘দ্য ওয়ার’-এর দীর্ঘ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনটি নিট বিতর্কের সমান্তরালে শিক্ষা ক্ষেত্রে সঙ্ঘের একচ্ছত্র আদর্শগত লড়াইয়ের পিছিয়ে পড়ার ছবিটি খুব স্পষ্ট করে সামনে এনেছে। রাজপথ থেকে শুরু করে সংসদ পর্যন্ত ছাত্র-যুবদের আছড়ে পড়া প্রতিবাদ এবং প্রশাসনিক কেলেঙ্কারির মাঝে শিক্ষা মন্ত্রকে এই ধাক্কা সামলে নাগপুর কীভাবে তাদের এজেন্ডা এগিয়ে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
