তেলেঙ্গানায় নির্বাচন কমিশনের (EC) চলমান ভোটার তালিকা যাচাইকরণ প্রক্রিয়া ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার সময়সীমা আরও অন্তত তিন মাস বাড়ানোর এবং রাজ্যজুড়ে একটি নিবিড় বহুভাষিক জনসচেতনতা প্রচার শুরু করার জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে ‘তেলেঙ্গানা ভোটার রাইটস ফোরাম’ (Telangana Voter Rights Forum)। ‘দ্য নিউজ মিনিট’ (The News Minute)-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, এই প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে বিশেষ করে প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন।
‘দ্য নিউজ মিনিট’-এর খবর অনুযায়ী, ৪ জুলাই হায়দরাবাদের সুন্দরাইয়া বিজ্ঞান কেন্দ্রমে তেলেঙ্গানা ভোটার রাইটস ফোরামের পক্ষ থেকে একটি জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে অবসরপ্রাপ্ত আমলা, আইনি বিশেষজ্ঞ, সমাজকর্মী এবং শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়ে এই ভোটার যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ফোরামের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছে যে, সাধারণ মানুষকে এই বাধ্যতামূলক ফরম পূরণের বিষয়টি বোঝাতে নির্বাচন কমিশনকে তেলুগু, ইংরেজি ও উর্দু—এই তিন ভাষায় সচেতনতা প্রচার চালাতে হবে। একই সঙ্গে ডেডিকেটেড ভোটার হেল্পলাইন চালু করা এবং বুথ লেভেল অফিসারদের (BLO) প্রতিদিন নির্দিষ্ট সহায়তা কেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।
বর্তমানে তেলেঙ্গানায় নির্বাচন কমিশনের এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া চলছে, যার অধীনে বুথ লেভেল অফিসাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার যাচাই করছেন এবং প্রাক-মুদ্রিত ফরম বিতরণ করছেন। এই প্রক্রিয়াটি আগামী ২৪ জুলাই পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে।
‘দ্য নিউজ মিনিট’-এর ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত আইএএস (IAS) অফিসার আকুনুরি মুরলি এই জনসভায় অভিযোগ করেছেন যে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজের দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত অংশকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি সংখ্যালঘূ, নারী, তপশিলি জাতি (SC) এবং তপশিলি উপজাতিদের (ST) স্বার্থের পরিপন্থী। তিনি বলেন, বর্তমানে পুরো প্রক্রিয়াটি বিএলও-দের (BLO) ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু বিএলও-রা নিজেরাই এই কাজ কীভাবে করতে হবে তা নিয়ে সম্পূর্ণ ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছেন।
প্রক্রিয়াটির জটিলতা কতটা মারাত্মক, তা বোঝাতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বি সুদর্শন রেড্ডি একটি মন্তব্য করেন। তিনি রসিকতার সুরে জানান যে, তিনি নিজে একজন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি হওয়া সত্ত্বেও ফরমটি কীভাবে পূরণ করতে হবে তা বুঝতে না পেরে সেটি একপাশে সরিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন, “আপনারা ভাবতেই পারেন যে মানুষটি এই ফরম পড়তে পারছে না, সে কীভাবে বিচারপতি হয়েছিল! আসলে বেশিরভাগ বিচারকেরাই জানেন না এটা কীভাবে পড়তে বা পূরণ করতে হয়।”
সুপ্রিম কোর্টের এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়াকে বহাল রাখার রায় নিয়েও সমালোচনা করেন বিচারপতি সুদর্শন রেড্ডি। ‘দ্য নিউজ মিনিট’ জানিয়েছে, বিচারপতি রেড্ডি ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের (CJI Surya Kant) দেওয়া একটি রায়ের সমালোচনা করে বলেন যে, আদালত ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২১(৩) ধারাটিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছে। এই আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন মনে করলে যেকোনোও কেন্দ্রের বা কেন্দ্রের নির্দিষ্ট অংশের ভোটার তালিকা বিশেষ সংশোধন করতে পারে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সারা দেশজুড়ে বা পুরো রাজ্য জুড়ে এই নিবিড় প্রক্রিয়া চালানো যাবে। তাছাড়া মূল আইনে ‘ইনটেনসিভ’ (নিবিড়) শব্দটির কোনো উল্লেখ নেই, সেখানে শুধু ‘স্পেশাল রিভিশন’ (বিশেষ সংশোধন)-এর কথা বলা হয়েছে। একজন ভোটার কখন ভোট দিয়েছেন, কোন বুথে দিয়েছেন—এইসব অতিরিক্ত তথ্য নেওয়া নির্বাচন কমিশনের কাজ হওয়া উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষের আন্দোলনের সাথে যুক্ত সমাজকর্মীরা এই প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের (ময়লা সংগ্রহকারী) পক্ষে কথা বলতে গিয়ে হাইমা নামের এক কর্মী জানান, তেলেঙ্গানার ১০টি জেলার শ্রমিকেরা এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছুই জানেন না। কারণ তাঁরা খুব ভোরে কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান এবং বিএলও-রা যখন বাড়ি আসেন, তখন স্বভাবতই তাঁদের পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে, তেলেঙ্গানা ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের (গৃহকর্মী ইউনিয়ন) সদস্য মঞ্জুলা জানান, এই বিভ্রান্তির কারণে গৃহকর্মীরা চরম আতঙ্কে রয়েছেন যে তাঁরা হয়তো সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো থেকে বঞ্চিত হবেন। অনেক কর্মী জানিয়েছেন যে বিএলও-রা এখনও তাঁদের বাড়িতে যাননি, আর গেলেও ভাষা ও ফরমের জটিলতার কারণে অনেকেই বুঝতে পারছেন না কীভাবে তা পূরণ করতে হবে।
‘দ্য নিউজ মিনিট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রবীণ তেলেঙ্গানা তাত্ত্বিক তথা এমএলসি (MLC) এম কোদণ্ডরাম এই পুরো বিষয়টিকে অত্যন্ত বৈষম্যমূলক বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এটি সাধারণ অর্থে কোনো ভোটার অধিকারের কর্মসূচি নয়, বরং এটি আসলে একটি নাগরিকত্ব নিবন্ধনের (citizenship registration) প্রচ্ছন্ন প্রক্রিয়া। সার্বিক এই জটিলতা দূর করতে নির্বাচন কমিশন দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে রাজ্যের বহু মানুষ ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন বলে ফোরামের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

