জন্তর মন্তরে পেপার লিক বিরোধী আন্দোলন: শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ঘিরে উত্তাল দেশ, অনশনে অসুস্থ ছাত্রনেতারা

জন্তর মন্তরে পেপার লিক বিরোধী আন্দোলন: শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ঘিরে উত্তাল দেশ, অনশনে অসুস্থ ছাত্রনেতারা

নয়াদিল্লি: দেশের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলিতে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম এবং শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের জেরে রাজধানী দিল্লির জন্তর মন্তর আবারও বৃহৎ ছাত্র-যুব আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন রাজ্যের শিক্ষার্থী, গবেষক, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের অভিযোগ, পরীক্ষা ব্যবস্থায় ধারাবাহিক দুর্নীতির ফলে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি হলো কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)-র কাঠামোগত সংস্কার বা বিলুপ্তি। আন্দোলনকারীদের মতে, শুধুমাত্র একটি পরীক্ষা নয়, বরং গোটা মূল্যায়ন ব্যবস্থার ওপর শিক্ষার্থীদের আস্থা ভেঙে পড়েছে।

এই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত দিক হলো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র উত্থান। প্রথমদিকে এটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করলেও, পরে তা বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলনের সংগঠকে পরিণত হয়। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে ২০ জুন থেকে জন্তর মন্তরে অবস্থান ও অনশন কর্মসূচি শুরু হয়।

সংগঠনের দাবি, পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন।

অনশনে অসুস্থ সোনম ওয়াংচুক ও দানিশ আলী

আন্দোলনের অন্যতম মুখ লাদাখের পরিবেশ ও শিক্ষা আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক ২৮ জুন থেকে অনশন শুরু করেন। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দীর্ঘ অনশনের ফলে তাঁর ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। তবুও তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন।

অন্যদিকে, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের যৌথ সম্পাদিকা দানিশ আলীর শারীরিক অবস্থারও অবনতি ঘটে। টানা কয়েকদিন শুধুমাত্র জল পান করে অনশন চালানোর ফলে তাঁর রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে নেমে যায়। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে দিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের শয্যায় তাঁর চিকিৎসার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে। তাঁদের দাবি, পুনঃপরীক্ষা, অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘ অপেক্ষার ফলে বহু পরীক্ষার্থী চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

এই প্রসঙ্গে দেরাদুনের এক নিট পরীক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাও আন্দোলনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে বহু তরুণ-তরুণী মানসিক সংকটে ভুগছেন। তাঁদের মতে, পরীক্ষা সংক্রান্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

এই আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। আম আদমি পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বামপন্থী কয়েকটি দল আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বিভিন্ন বিরোধী নেতা জন্তর মন্তরে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং বিষয়টি সংসদে তোলার আশ্বাস দিয়েছেন।

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলন নিয়ে কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাঁদের দাবিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।

আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন, জন্তর মন্তরে অনশনরত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় পানীয় জল, স্যানিটেশন এবং অন্যান্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। পাশাপাশি আন্দোলনস্থলে পুলিশি হস্তক্ষেপ এবং বইয়ের স্টলে ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

কী চাইছেন আন্দোলনকারীরা?

আন্দোলনকারীদের দাবি, শুধুমাত্র একটি পরীক্ষার তদন্ত নয়, বরং গোটা পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। তাঁদের মূল দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে—

  • এনটিএ-র কাঠামোগত সংস্কার বা নতুন স্বশাসিত পরীক্ষা সংস্থা গঠন।
  • প্রশ্নপত্র সুরক্ষায় উন্নত ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা।
  • পেপার লিকের সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি।
  • পরীক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কেন্দ্র গঠন।
  • নিয়োগ ও প্রবেশিকা পরীক্ষায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

জন্তর মন্তরের এই আন্দোলন এখন শুধুমাত্র পেপার লিকের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে বৃহত্তর জনআন্দোলনের রূপ নিচ্ছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ রক্ষার স্বার্থে দ্রুত সংস্কার না হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও গভীর সংকটে পড়বে।

এখন নজর কেন্দ্রীয় সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা হবে, নাকি আন্দোলন আরও বিস্তৃত হবে—সেই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নির্ধারণ করতে পারে।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply