আমাদের জমির দলিল ছিল’: আসামের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ গোয়ালপাড়ায় ৭৩টি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে, বাসিন্দাদের প্রতিবাদ।

আমাদের জমির দলিল ছিল’: আসামের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ গোয়ালপাড়ায় ৭৩টি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে, বাসিন্দাদের প্রতিবাদ।

গোয়ালপাড়া, ৯ সেপ্টেম্বর:

বৈধ জমির মালিকানা সংক্রান্ত নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও আসামের মুসলিম অধ্যুষিত গোয়ালপাড়া জেলায় এক উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ৭৩টি বসতবাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। কৃষিজমি হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় উপযুক্ত সরকারি অনুমতি ছাড়া অবৈধভাবে বসতি গড়ে তোলার অভিযোগে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। সরকারি এই উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিবাদে নেমেছেন স্থানীয় বাসিন্দা এবং একাধিক সংখ্যালঘু ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, গোয়ালপাড়া জেলার কৃষ্ণাই এলাকার অধীন পাঁচটি রাজস্ব গ্রামে এই যৌথ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। চিহ্নিত গ্রামগুলির মধ্যে রয়েছে খারিজা পাইকান, খামার মানিকপুর, ভোজমালা পার্ট-টু, জাতশারবাড়ি এবং টেঙ্গাবাড়ি। সোমবার চালানো এই অভিযানে এলাকা থেকে সমস্ত কাঠামো উচ্ছেদ করতে বুলডোজার, জেসিবি এবং একাধিক এক্সকাভেটর ব্যবহার করা হয়।

জেলা প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা তাঁদের ব্যবহৃত জমির চরিত্র পরিবর্তনের অনুমতি না নিয়েই কৃষিজমির ওপর আবাসিক বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। গোয়ালপাড়ার জেলাশাসক প্রদীপ তিমুং জানিয়েছেন, কৃষিজমি, প্রাকৃতিক জলাশয় এবং স্বাভাবিক জল নিকাশি ব্যবস্থা রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এলাকাটি সম্পূর্ণ কৃষিজমি ছিল, কিন্তু সেখানে রাতারাতি বসতি গড়ে উঠছিল। এর ফলে স্বাভাবিক জল প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জলাশয়গুলি অস্তিত্ব সংকটে পড়ছিল।

প্রশাসনের তরফে আরও জানানো হয়েছে, মাটিয়া রাজস্ব সার্কেল অফিসারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বাসিন্দাদের আগেই নোটিস দেওয়া হয়েছিল। সেই নোটিসে এলাকা খালি করে নিজেদের কাঠামো সরিয়ে নেওয়ার জন্য ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কোনো পরিবারই সেখান থেকে সরে যায়নি বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।

অন্য দিকে স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংখ্যালঘু সংগঠনগুলি প্রশাসনের এই ভূমিকার তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের দাবি, উচ্ছেদের মুখে পড়া পরিবারগুলির কাছে নিজেদের জমির বৈধ কাগজপত্র ও মালিকানার প্রমাণ রয়েছে। নর্থ ইস্ট মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি নুরুল ইসলাম জানান, যাঁদের বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে তাঁরা প্রত্যেকেই নিজস্ব জমিতে বসবাস করছিলেন এবং তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় বৈধ নথিপত্র রয়েছে। জমিগুলি কোনোভাবেই সরকারি সম্পত্তি ছিল না। একমাত্র বিষয় ছিল জমিগুলি কৃষিজমি হিসেবে নথিবদ্ধ থাকা। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং এই ধরনের উচ্ছেদ অভিযান পুনর্বিবেচনা করার দাবি জানান।

উচ্ছেদ অভিযানের কড়া সমালোচনা করে মুসলিম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অফ আসামের সভাপতি আশিক রব্বানি মন্তব্য করেছেন, নিজেদের মালিকানাধীন কৃষিজমিতে বাড়ি তৈরি করা কোনো অবস্থাতেই ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। এই ধরনের পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকে চরম সংকটে ফেলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তবে এই উচ্ছেদ অভিযানে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে নিশানা করার অভিযোগ পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছেন জেলাশাসক প্রদীপ তিমুং। তিনি জানান, প্রশাসনিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে দরং, বরপেটা, ধুবড়ি এবং মানকাচর-সহ বিভিন্ন জেলা থেকে এসে বহু মানুষ এই এলাকায় বসবাস শুরু করেছিলেন। এটি হিন্দু বা মুসলিম কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়। এমনকি কৃষিজমির ওপর এভাবে অপরিকল্পিতভাবে বাড়ি তৈরির বিরুদ্ধে কয়েকজন স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাও আগেই অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply