কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি, শপথ নিলেন রবীন্দ্র ভি গুঘে

কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি, শপথ নিলেন রবীন্দ্র ভি গুঘে

সাইকেল চালিয়ে ল’ কলেজে যাওয়া থেকে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি, শপথ নিলেন রবীন্দ্র ভি গুঘে

ওয়েব ডেস্ক, বাংলাকাল:
সাইকেলে চড়ে ল’ কলেজে যাতায়াত করা এক প্রথম প্রজন্মের আইনজীবী থেকে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী আদালত কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি—দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়ে বুধবার নতুন দায়িত্ব নিলেন বিচারপতি রবীন্দ্র ভি গুঘে

পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল আর এন রবি তাঁকে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করান। তিনি কলকাতা হাইকোর্টের ৪৫তম প্রধান বিচারপতি

শপথগ্রহণের পর নিজের দীর্ঘ যাত্রার কথা তুলে ধরে বিচারপতি গুঘে বলেন, তাঁর এই পথচলা ছিল সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা, অধ্যবসায় এবং পরিবারের আশীর্বাদে পূর্ণ। তিনি জানান, তিনি একজন প্রথম প্রজন্মের আইনজীবী—আইনজীবী পরিবারের কোনও উত্তরাধিকার তাঁর ছিল না।

‘সাইকেলের আসন থেকে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির চেয়ার’

নিজের বক্তব্যে বিচারপতি গুঘে বলেন, “সাইকেলের আসন থেকে এই গৌরবময় কলকাতা হাইকোর্টের কেন্দ্রীয় চেয়ারে পৌঁছনোর যাত্রা আমাদের মহান গণতন্ত্রের এক স্থায়ী প্রতিশ্রুতি।”

তাঁর কথায়, এই যাত্রা প্রমাণ করে যে আইন পেশায় কঠোর পরিশ্রম, সততা এবং নিরলস নিষ্ঠা থাকলে সাধারণ পারিবারিক পরিসর থেকে সর্বোচ্চ সম্মানের জায়গায় পৌঁছনো সম্ভব।

নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, ল’ কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় প্রতিদিন প্রায় ৪ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে কলেজে যেতেন। আইন পেশার প্রতি গভীর আগ্রহই তাঁকে প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

পরবর্তীতে পেশার শুরুর দিকের অনিশ্চিত সময়ে প্রায় সাড়ে সাত বছর একটি মোটরসাইকেল ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। আদালতে দীর্ঘ সময়ের কাজ, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং প্রতিষ্ঠিত না হওয়া এক তরুণ আইনজীবীর একাকী লড়াই—সবকিছুর সাক্ষী ছিল সেই মোটরসাইকেল।

এই দীর্ঘ যাত্রায় স্ত্রী বর্ষা এবং পরিবারের ত্যাগ ও সমর্থনের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি।

‘ভয় বা পক্ষপাত ছাড়াই ন্যায়বিচার’

কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়াকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন বিচারপতি গুঘে।

তিনি বলেন, এই ভূমি স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। তাঁর মতে, বাংলাই ঐতিহাসিকভাবে ভারতের নবজাগরণের অন্যতম কেন্দ্র এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমি।

কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী মহলের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এই আদালতের আইনজীবীরা সারা দেশে তাঁদের স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং সমৃদ্ধ যুক্তিতর্কের ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত

বিচারপতি গুঘের কথায়, কলকাতা হাইকোর্টের রয়েছে “ভয় বা পক্ষপাত ছাড়াই ন্যায়বিচার প্রদানের গৌরবময় ঐতিহ্য”। বিচারব্যবস্থাকে তিনি একটি সোনার রথের সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে বেঞ্চ ও বার—দুটি চাকা। দুই পক্ষের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই ন্যায়বিচারের সেই রথ এগিয়ে যাবে বলে জানান তিনি।

প্রযুক্তির ব্যবহার ও মামলার জট কমানোর বার্তা

প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাঁর অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বিচারব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য করার কথা বলেন বিচারপতি গুঘে।

তিনি বলেন, সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষের কাছেও বিচারব্যবস্থার দরজা খোলা রাখতে হবে। আদালতকে আরও সহজলভ্য ও স্বচ্ছ করে তুলতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উপরও জোর দেন তিনি।

একইসঙ্গে আদালতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মামলার পেন্ডেন্সি বা মামলার জট দ্রুত কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের বিচারব্যবস্থার উপর যে আস্থা রয়েছে, তা কোনওভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।

তরুণ আইনজীবীদের জন্য বার্তা

নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের উদ্দেশেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন প্রধান বিচারপতি গুঘে।

তিনি বলেন, শুরুর পথ যতই কঠিন ও প্রতিকূল হোক না কেন, আইন পেশায় সততা ও পরিশ্রমের মূল্য রয়েছে।

তাঁর পরামর্শ—“মাথা নিচু রেখে কাজ করুন, মামলার নথি ভালোভাবে পড়ুন এবং কখনও নিজের নৈতিকতার সঙ্গে আপস করবেন না।”

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তরুণ আইনজীবীদের এই বার্তা দিয়েছেন তিনি।

শুভেচ্ছা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী সুবেন্দু অধিকারী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সুবেন্দু অধিকারী। তিনি বিচারপতি গুঘেকে শুভেচ্ছা জানান এবং সৌজন্যের নিদর্শন হিসেবে তাঁর হাতে একটি ফুলের তোড়া ও স্বামী বিবেকানন্দের একটি বাঁধানো ছবি তুলে দেন।

সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছাবার্তায় সুবেন্দু অধিকারী আশা প্রকাশ করেন, বিচারপতি গুঘের মেয়াদ রাজ্যে আইনের শাসন ও সাংবিধানিক মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য দ্রুত ও ন্যায্য বিচার নিশ্চিত হবে।

অন্যদিকে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিচারপতি গুঘেকে স্বাগত জানিয়ে তাঁর নতুন দায়িত্বের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

সাইকেল থেকে শুরু করে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির আসন—রবীন্দ্র ভি গুঘের এই জীবনযাত্রা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ হিসেবেও উঠে এসেছে।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply