লোভ ও নৃশংসতার চরম নজির: জয়পুরে সরকারি চাকরি ও সম্পত্তির জন্য ৭ লাখ টাকায় ‘সুপারি’ দিয়ে মাকে খুন করাল ২৩ বছরের মেয়ে, গ্রেপ্তার ৭

লোভ ও নৃশংসতার চরম নজির: জয়পুরে সরকারি চাকরি ও সম্পত্তির জন্য ৭ লাখ টাকায় ‘সুপারি’ দিয়ে মাকে খুন করাল ২৩ বছরের মেয়ে, গ্রেপ্তার ৭

জয়পুর,৯ জুলাই ২০২৬:: রাজস্থানের রাজধানী জয়পুরে সড়ক দুর্ঘটনার আড়ালে এক মর্মান্তিক ও নৃশংস চুক্তিভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের (Contract Killing) রহস্য উন্মোচন করেছে স্থানীয় পুলিশ। মাত্র ২৩ বছর বয়সী এক তরুণী নিজের জন্মদাত্রী মাকে খুন করতে ৭ লক্ষ টাকার সুপারি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মূল উদ্দেশ্য—মৃত মায়ের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি হস্তগত করা এবং অনুকম্পামূলক ভিত্তিতে (Compassionate Grounds) মায়ের সরকারি চাকরিটি নিজের নামে বাগানো। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গণমাধ্যম ‘ওয়ানইন্ডিয়া’ (Oneindia), ‘ইন্ডিয়া টুডে’ (India Today) এবং ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ (Times of India)-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশ এই ঘটনায় নিহতের মেয়েসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে। জয়পুরের প্রতাপ নগর এলাকার বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী নীরজ শর্মা তাঁর ছেলেকে একটি কোচিং সেন্টারে নামিয়ে দিয়ে স্কুটার চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। বিকেল আনুমানিক পৌনে পাঁচটা নাগাদ একটি দ্রুতগামী ‘স্কোর্পিও’ (Scorpio) এসইউভি গাড়ি পেছন থেকে এসে প্রায় ১৩০ কিমি প্রতি ঘণ্টা গতিতে তাঁর স্কুটারে প্রচণ্ড ধাক্কা মারে। ধাক্কার তীব্রতায় নীরজ দেবী শূন্যে প্রায় ১০০ ফুট উঁচুতে ছিটকে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে এটিকে একটি সাধারণ পথ দুর্ঘটনা মনে করা হলেও, ঘটনার পর গাড়িটি নিয়ে চালক দ্রুত চম্পট দেওয়ায় পুলিশের সন্দেহ দানা বাঁধে। পরবর্তীতে নিহতের ভাই রাকেশ কুমার শর্মা ভাগ্নি আয়ুষী এবং তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদ ও হুমকির অভিযোগ এনে এফআইআর (FIR) দায়ের করলে পুলিশ তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

জয়পুর পূর্ব জোনের ডিসিপি (DCP East) রঞ্জিতা শর্মা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পুলিশ ওই এলাকার সমস্ত সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করলে স্পষ্ট হয় যে, এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল না। ঘাতক গাড়িটি বেশ কিছু সময় ধরে নীরজ দেবীর গতিবিধির ওপর নজর রাখছিল এবং সুযোগ বুঝে তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পিষে দিয়ে যায়। পুলিশি জেরার মুখে পড়ে নীরজ দেবীর ২৩ বছর বয়সী মেয়ে আয়ুষী শর্মা নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেন এবং পুরো চক্রান্তের কঙ্কালসার চেহারা সামনে আসে।

পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, নীরজ শর্মার স্বামী বিজয় কুমার শর্মা প্রায় এক বছর আগে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর নীরজ দেবী অনুকম্পামূলক নিয়োগের মাধ্যমে জয়পুরের একটি আদালতে লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক (LDC) হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু মেয়ে আয়ুষী চেয়েছিলেন সেই চাকরিটি যেন তাঁকে দেওয়া হয়। এই নিয়ে মা ও মেয়ের মধ্যে গত এক বছর ধরে তীব্র মানসিক চাপ ও প্রায় দুই-তিন বছর ধরে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ চলছিল। আনুমানিক ১৪ কোটি টাকার পারিবারিক সম্পত্তি সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং মায়ের মৃত্যুর পর ফাঁকা হওয়া সরকারি চাকরিটি পাওয়ার লোভেই আয়ুষী তাঁর মাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।

তদন্তকারীদের দাবি, আয়ুষী তাঁর এই নৃশংস চক্রান্তে শামিল করেছিলেন নিজের কাকা মোহন স্বরূপ এবং খুড়তুতো ভাই বলরাম ওরফে রবিকে। তাঁরা ভরতপুরের বাসিন্দা পেশাদার খুনি হেমন্ত শর্মাকে ৭ লক্ষ টাকার সুপারি দেন। প্রায় এক মাস ধরে নীরজ দেবীর দৈনন্দিন জীবনের রুটিন ‘রেকিমুক্ত’ বা পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রথমবার একটি ভাড়া করা ‘থার’ (Thar) গাড়ি দিয়ে হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও, ৩ জুলাই স্কোর্পিও গাড়ি ব্যবহার করে তাঁরা সফল হয়। খুনের দিন অপর এক অভিযুক্ত মোহিত শর্মা নীরজ দেবীর লোকেশন ট্র্যাক করে কিলারদের জানাচ্ছিলেন এবং রোহিত জাতব নামে এক যুবক মোটরসাইকেল নিয়ে ব্যাকআপ হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন আকাশ শর্মা এবং তাঁর সাথে ছিলেন অরবিন্দ শর্মা।

পুলিশ এই ঘটনায় এখনো পর্যন্ত মূল পরিকল্পনাকারী মেয়ে আয়ুষী শর্মা, কাকা মোহন স্বরূপ, মোহিত শর্মা, আকাশ শর্মা, অরবিন্দ শর্মা, হেমন্ত শর্মা এবং রোহিত জাতবসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে এই ঘটনার অন্যতম প্রধান চক্রান্তকারী আয়ুষীর ভাই বলরাম ওরফে রবি এখনো পলাতক, তাঁর খোঁজে পুলিশি তল্লাশি জারি রয়েছে। এই ঘটনাটি প্রকাশ পেতেই গোটা রাজস্থানসহ দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। সামান্য চাকরি ও টাকার লোভে নিজের জন্মদাত্রী মাকে এভাবে নৃশংসভাবে খুন করার ঘটনা আধুনিক সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কেই চরমভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply