কলকাতা, ২৬ জুলাই: তিলোত্তমার রাজপথে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ‘আজাদী’র স্লোগান। শুরুতে যা ছিল কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিবাদ ও সংহতির মিছিল, সময়ের সাথে সাথে তা পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে এক বৃহত্তর গণবিদ্রোহে। সংবাদসংস্থা মাকতুব (Maktoob Media)-এর এক বিশেষ ও বিশদ প্রতিবেদনে কলকাতা শহরের সাম্প্রতিক এই নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলনের চিত্রটি ফুটে উঠেছে। প্রথাগত রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে শহরের তরুণ ও ছাত্রসমাজ যেভাবে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ‘আজাদী’ স্লোগানকে পুনরায় আপন করে নিয়ে রাজপথে নেমেছে, তা পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতি ও নাগরিক আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মাকতুবের বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর থেকে দক্ষিণ— কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রী, স্বাধীন সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন বামপন্থী ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের কর্মী-সমর্থকেরা রাজপথে একত্রিত হন। শুরুতে একটি নির্দিষ্ট দাবির প্রেক্ষাপটে এবং সংহতি জানানোর উদ্দেশ্যে এই পদযাত্রার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তবে বিক্ষোভ মিছিলটি যখন কলকাতার প্রাণকেন্দ্রের দিকে এগোতে থাকে, তখন আন্দোলনকারীদের সুর ও মেজাজ পরিবর্তিত হয়। একের পর এক প্রশাসনিক বিধিনিষেধ, পুলিশের প্রতিবন্ধকতা এবং আন্দোলন দমনের চেষ্টার মুখোমুখি হয়ে পড়ুয়ারা তাঁদের এই পদযাত্রাকে সার্বিক দমনপীড়নের বিরুদ্ধে এক বৃহৎ রাজনৈতিক প্রতিবাদে পরিণত করে।
‘আজাদী’— এই একটিমাত্র শব্দ বহু বছর ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজপথের আন্দোলনে নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মাকতুবের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কলকাতার রাজপথে ছাত্রছাত্রীদের কণ্ঠে এই স্লোগানটি নতুন করে পুনর্জীবন পেয়েছে। আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের বক্তব্য, তাঁদের এই ‘আজাদী’ কেবল কোনো একটি সংকীর্ণ রাজনৈতিক দাবি নয়; বরং এটি পুলিশি বর্বরতাসূচক পদক্ষেপ থেকে মুক্তি, ক্যাম্পাসে বাকস্বাধীনতা রক্ষা, প্রশাসনিক স্বৈরাচারিতা থেকে মুক্তি এবং সার্বিক সামাজিক ন্যায়বিচারের অধিকার আদায়ের এক জোরালো আহ্বান।
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এক ছাত্রনেতা মাকতুবকে জানান, “আমাদের ওপর যখনই পুলিশি বা প্রশাসনিক লাঠি ও ভয় দেখানোর নীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তখনই আমরা আন্দোলনকে আরও দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিয়েছি। আমাদের এই সংহতি পদযাত্রা কেবল একদিনের কোনো সাধারণ রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি তরুণ প্রজন্মের গণতান্ত্রিক কণ্ঠ স্তব্ধ করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে এক চরম বিদ্রোহ।”
প্রতিবেদনে আরও তুলে ধরা হয়েছে যে, ছাত্র মিছিলটি এগোতে থাকলে একাধিক মোড়ে পুলিশ ভারী ব্যারিকেড তৈরি করে পথ অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করে। বেশ কিছু জায়গায় পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে তীব্র ধস্তাধস্তি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে এবং ছাত্রনেতাদের আটক করতে পুলিশি তৎপরতা দেখা গেলেও, বিশাল জনস্রোতের কাছে প্রশাসনিক বাধা ব্যর্থ হয়। ব্যারিকেডের সামনেই বব ডিলান কিংবা কবির সুমনের প্রতিবাদের সুর তুলে, ফেস্টুন উঁচিয়ে এবং সরকার ও পুলিশ বিরোধী স্লোগান দিয়ে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন পড়ুয়ারা।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই অদম্য মনোভাব ও রাজপথে অটল অবস্থান সংহতি মিছিলটিকে এক বিশাল ছাত্র জনসভায় রূপান্তরিত করে। মাকতুবের বিশেষ প্রতিবেদনে এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতার বুকে অন্যতম বৃহৎ ও প্রথাগত দলীয় শাসনমুক্ত ছাত্র প্রতিরোধ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুরু করে রাজ্য স্তরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে যেভাবে প্রশাসনিক শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে, কলকাতার এই পদযাত্রা তার বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত প্রতিবাদ তৈরি করেছে। নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ এবং প্রবীণ মানবাধিকার কর্মীরাও শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহকে সমর্থন জানিয়েছেন।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, তিলোত্তমার বুথে তরুণ প্রজন্মের এই ‘আজাদী’র গর্জন এবং দমনপীড়নের বিরুদ্ধে একজোট হওয়া প্রমাণ করে যে, ভয় দেখিয়ে আন্দোলন স্তব্ধ করার পুরোনো নীতি আর কাজ করছে না। মাকতুবের তথ্য অনুযায়ী, রাজপথের এই অনমনীয় মনোভাব অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে এই ছাত্র বিদ্রোহ আরও বিস্তৃত রূপ নিতে পারে, যা কেন্দ্র ও রাজ্য প্রশাসনের ওপর সমানভাবে চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
