পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাতি নুশলি ওয়াদিয়া ভারতীয় জনসংঘের অন্যতম প্রধান অর্থদাতা ছিলেন।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাতি নুশলি ওয়াদিয়া ভারতীয় জনসংঘের অন্যতম প্রধান অর্থদাতা ছিলেন।

কলকাতা, ১৭ জুলাই: আম আদমি পার্টি (AAP)-র একটি সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে। ওই পোস্টে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)-র বিরুদ্ধে ‘ভণ্ডামি’র অভিযোগ এনে দাবি করা হয়েছে যে, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাতি নুশলি ওয়াদিয়া ভারতীয় জনসংঘের (যা বর্তমান বিজেপির পূর্বসূরি) অন্যতম প্রধান অর্থদাতা ছিলেন। শুধু তাই নয়, বিজেপি শাসনের সময় প্রধানমন্ত্রীর দফতরেও (PMO) তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল বলে আম আদমি পার্টির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

এই রাজনৈতিক তরজার আবহে ভারতের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক বিনয় সীতাপতির লেখা ‘জুগলবন্দি’ (Jugalbandi) বইটির ঐতিহাসিক তথ্য সূত্র হিসেবে উঠে এসেছে। যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, পার্সি শিল্পপতি নুশলি ওয়াদিয়ার সঙ্গে জনসংঘ এবং পরবর্তীকালে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও ঐতিহাসিক ছিল।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, নুশলি ওয়াদিয়া মাতৃসূত্রে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাতি হলেও, পিতৃসূত্রে তিনি একটি ঐতিহ্যবাহী পার্সি শিল্পপতি পরিবারের সন্তান। বিনয় সীতাপতির বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সত্তরের দশকে বাবার মৃত্যুর পর নুশলি ওয়াদিয়া পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেন এবং সেই সময় থেকেই তিনি আরএসএস (RSS) ও জনসংঘের ভাবধারার প্রতি আকৃষ্ট হন।

তৎকালীন সময়ে ভারতীয় জনসংঘ যখন রাজনৈতিকভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার জন্য লড়াই করছিল, তখন ওয়াদিয়া তাদের পাশে এসে দাঁড়ান। সত্তরের দশক থেকে তিনি জনসংঘকে বিপুল পরিমাণে আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে শুরু করেন। বইটিতে দাবি করা হয়েছে, তিনি শুধুমাত্র দলীয় তহবিলেই অনুদান দেননি, বরং দলের পূর্ণ সময়ের কর্মীদের জন্য মাসিক ভাতার (Stipend) ব্যবস্থাও করেছিলেন।

আম আদমি পার্টির পোস্ট করা ভিডিওটিতে মূলত ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর একটি প্যানেল আলোচনার অংশ তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে সীতাপতির এই বইটি নিয়ে বিস্তারিত চর্চা হয়। আলোচনায় ওয়াদিয়াকে জনসংঘ ও বিজেপির ‘মূল অর্থদাতা’ (Original Funder) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আর্থিক সম্পর্কের সমীকরণটি কেবল ব্যবসায়িক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ওয়াদিয়ার সঙ্গে জনসংঘের তৎকালীন অন্যতম প্রধান স্তম্ভ নানাজী দেশমুখের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আদবানীর মতো বিজেপির শীর্ষ সারির নেতাদের সঙ্গেও তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্তরে গভীর যোগাযোগ তৈরি হয়। নব্বইয়ের দশকের শেষে বাজপেয়ী সরকার যখন কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে, তখন ওয়াদিয়ার এই প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং প্রধানমন্ত্রীর দফতরে (PMO) তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল বলে ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

আপ-এর এই আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল বিজেপির চেনা জাতীয়তাবাদী আদর্শকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। বিজেপি সাধারণত জিন্নাহর আদর্শ বা পাকিস্তানের নাম নিয়ে বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করে থাকে। সেই জায়গায় জিন্নাহর নিজের বংশধরের কাছ থেকে বিজেপির পূর্বসূরিদের আর্থিক সাহায্য নেওয়ার বিষয়টি সামনে এনে আপ এটিকে বিজেপির ‘দ্বিমুখী নীতি’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় রাজনীতির এই অধ্যায়টি আসলে আদর্শগত বৈরিতার আড়ালে থাকা এক জটিল পারস্পরিক ও পারিবারিক মেলবন্ধনের চিত্র প্রদর্শন করে। নুশলি ওয়াদিয়া নিজে কখনো মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, বরং ভারতের মাটিতে একজন প্রথম সারির পার্সি শিল্পপতি হিসেবেই তিনি নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। তা সত্ত্বেও, জিন্নাহর সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্কের সূত্রটিকে হাতিয়ার করে বর্তমান রাজনীতিতে বিজেপিকে অস্বস্তিতে ফেলার এই কৌশল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply