গুয়াহাটি, ২৬ জুলাই: প্রশাসনিক অনুমতি চেয়ে আবেদন করা সত্ত্বেও নিট (NEET-UG) প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সংগঠিত করতে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরির অভিযোগে অসমে তিন মুসলিম ছাত্রকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠাল পুলিশ। সংবাদসংস্থা মাকতুব (Maktoob Media)-র এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অসম পুলিশের এই বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট পদক্ষেপের ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। আন্দোলন শুরুর আগেই গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতা খর্ব করার উদ্দেশ্যে যেভাবে ছাত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে, তা নিয়ে রাজ্য রাজনৈতিক ও নাগরিক মহলে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
মাকতুবের বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়া তিন ছাত্র হলেন গুয়াহাটি ও সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। দেশে হাজার হাজার পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ধ্বংসকারী নিট কেলেঙ্কারির সঠিক তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের পুনর্বিচারের দাবিতে তাঁরা রাজপথে একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করতে চেয়েছিলেন। আন্দোলনের সমন্বয় রক্ষা করতে এবং অন্যান্য ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের যুক্ত করতেই একটি সাধারণ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, দায়িত্বশীল নাগরিক ও ছাত্র হিসেবে তাঁরা এই সমাবেশের আইনি অনুমতির জন্য পুলিশের কাছে লিখিত আবেদনও জানিয়েছিলেন। তবে অনুমতি দেওয়ার পরিবর্তে, অসম পুলিশ সেই আবেদনকেই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে অতর্কিতে অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করে।
সংবাদসংস্থা মাকতুবের প্রাপ্ত তথ্য ও আইনি নথিপত্র অনুসারে, পুলিশি হেফাজত শেষে ওই তিন ছাত্রকে গুয়াহাটির স্থানীয় আদালতে পেশ করা হলে আদালত তাঁদের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে কারাগারে পাঠায়। গ্রেফতার হওয়া ছাত্রদের আইনজীবী ও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, কোনো সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড, সহিংসতা বা অন্যায় অপরাধে যুক্ত থাকার প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও কেবল বিশেষ একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ার কারণেই তাঁদের ওপর পুলিশি ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করা হয়েছে।
আইনজীবীদের দাবি, সংবিধানের ১৯(১)(বি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। আন্দোলন সংগঠিত করতে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করা এবং সেই সংক্রান্ত বিষয়ে আগেভাগে পুলিশকে লিখিতভাবে জানানো কোনো ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়ে না। তা সত্ত্বেও তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ও জামিনঅযোগ্য ধারায় মামলা দিয়ে পুলিশি হেফাজতে নিপীড়ন চালানো হয়েছে।
মাকতুবের প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংগঠন ও রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে বলা হয়েছে, বিজেপি শাসিত অসম সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংখ্যালঘু ছাত্রসমাজকে টার্গেট করছে। নিট দুর্নীতির মূল অপরাধী ও প্রশ্নফাঁস চক্রের মাস্টারমাইন্ডদের ধরার ক্ষেত্রে সরকারের যেখানে কোনো লক্ষণীয় তৎপরতা নেই, সেখানে নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়া তরুণ মুসলিম শিক্ষার্থীদের জেলে পুরে ভয় ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে।
আটক ছাত্রদের পরিবারের সদস্যরা মাকতুবকে অত্যন্ত করুণ সুরের সাথে জানান, “আমাদের সন্তানেরা কোনো অপরাধী নয়, তারা দেশের ভবিষ্যৎ। একটি প্রবেশিকা পরীক্ষার স্বচ্ছতা দাবি করা কি অপরাধ? পুলিশ অনুমতি দেওয়ার নাম করে ডেকে নিয়ে গিয়ে মিথ্যা মামলায় জেলে পুরে দিল। রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আইনি পথ অবলম্বন করলেও আমাদের সন্দেহ করা হচ্ছে।”
সংবাদ সংস্থা মাকতুবের বিশ্লেষণে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, এই ঘটনা অসমে বাড়তে থাকা ডিজিটাল সেন্সরশিপ এবং নজরদারি রাষ্ট্রের এক চরম নিদর্শন। হোয়াটসঅ্যাপের মতো ব্যক্তিগত এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মে গ্রুপের মাধ্যমে আইনি প্রতিবাদের পরিকল্পনা করাকেও এখন ‘জনশান্তি বিঘ্নিত করার চক্রান্ত’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এই চরম প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অসম সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থা তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। অনতিবিলম্বে ওই তিন ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং তাঁদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার হুঙ্কার দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের এই দমনমূলক নীতি নিট আন্দোলনের আগুন নিভিয়ে দেওয়ার বদলে অসমের মাটিতে গণবিক্ষোভের নতুন সলতে পাকিয়ে দিল বলেই মনে করছে অভিজ্ঞ মহল।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
