বাঁকিপুর উপনির্বাচনে টাকার পাহাড়! প্রশান্ত কিশোরের বিরুদ্ধে বেনামি সংস্থা ও ফেক অ্যাকাউন্টের অভিযোগ নিয়ে কমিশনের দ্বারস্থ বিজেপি

বাঁকিপুর উপনির্বাচনে টাকার পাহাড়! প্রশান্ত কিশোরের বিরুদ্ধে বেনামি সংস্থা ও ফেক অ্যাকাউন্টের অভিযোগ নিয়ে কমিশনের দ্বারস্থ বিজেপি

পাটনা, ২২ জুলাই: বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিহারের রাজনীতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এবার জন সুরাজ পার্টির (JSP) নেতা তথা এই কেন্দ্রের প্রার্থী প্রশান্ত কিশোরের বিরুদ্ধে নির্বাচনী খরচের নির্দিষ্ট সীমা লঙ্ঘন এবং বেনামি বা শেল কোম্পানির (Shell companies) মাধ্যমে বিপুল অর্থের লেনদেনের মারাত্মক অভিযোগ তুলল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, বিহার বিজেপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল সরাসরি ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করে এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত স্মারকলিপি বা মেমোরেন্ডাম জমা দিয়েছে। ভুয়ো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট এবং বট নেটওয়ার্ক (Bot networks) ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টার মতো গুরুতর বিষয়গুলিও এই স্মারকলিপিতে তুলে ধরা হয়েছে।
বিজেপির এই শক্তিশালী প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন বিহার সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তিওয়ারি, বিধায়ক জীবেশ মিশ্র, বিধান পরিষদের চিফ হুইপ জনক রাম, রাজ্য বিজেপির মিডিয়া ইন-চার্জ দানিশ ইকবাল এবং দলের নির্বাচন কমিশন সেলের আহ্বায়ক রাকেশ ঠাকুর। নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের কাছে নিজেদের অভিযোগ নথিভুক্ত করার পর, রাজ্য বিজেপির সদর কার্যালয়ে একটি বিশেষ সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেই সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দলের প্রবীণ নেতা ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সৈয়দ শাহনওয়াজ হোসেন স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে কোনও ব্যক্তির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে ঠিকই, কিন্তু নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নিয়মকানুন ও বিধিনিষেধ কঠোরভাবে মেনে চলা সকলের জন্যই বাধ্যতামূলক।



সাংবাদিক সম্মেলনে শাহনওয়াজ হোসেন সরাসরি অভিযোগ করেন যে, বাঁকিপুর উপনির্বাচনে প্রচার চালানোর জন্য প্রশান্ত কিশোর ইতিমধ্যেই কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ফেলেছেন, যা নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া ৪০ লক্ষ টাকার সর্বাধিক সীমার থেকে বহুগুণ বেশি। বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করেছে যে, এই বিপুল পরিমাণ খরচের সপক্ষে তাদের কাছে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ (documentary evidence) রয়েছে এবং তা ইতিমধ্যেই কমিশনের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয়েছে।
শুধু তাই নয়, বিজেপির দাবি, প্রকৃত নির্বাচনী ব্যয় গোপন রাখার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ও সুপরিকল্পিত প্রচার চালানো হচ্ছে। কৃত্রিম জনমত বা ‘আর্টিফিসিয়াল পাবলিক সেন্টিমেন্ট’ তৈরি করার জন্য ভুয়ো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের (influencers) অবৈধভাবে টাকা দেওয়া হচ্ছে। বিজেপি নেতাদের আরও দাবি, ‘সিম্পল সেন্স অ্যানালিটিক্স প্রাইভেট লিমিটেড’ (Simple Sense Analytics Pvt. Ltd.) এবং ‘নিউজ লাইটহাউস এলএলপি’ (News Lighthouse LLP)-র মতো কিছু সংস্থার মাধ্যমে এই গোটা নির্বাচনী প্রচারটি পরিচালিত হচ্ছে, যেগুলির সঙ্গে প্রশান্ত কিশোরের সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে বলে স্পষ্টত মনে করা হচ্ছে। এই সমগ্র ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পাশাপাশি, অর্থের আসল উৎস খুঁজে বের করার জন্য এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর অবিলম্বে হস্তক্ষেপ দাবি করেছে বিজেপি নেতৃত্ব।



এই সাংবাদিক সম্মেলনেই বিহারের শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তিওয়ারি অত্যন্ত গুরুতর একটি বিষয় উত্থাপন করেন। তিনি জানান, দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হচ্ছে এমন বেশ কিছু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য প্রমাণ-সহ নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বিহারের রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করার জন্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কুরুচিকর ও আপত্তিকর ভাষা প্রয়োগ করার জন্য এই সমস্ত বিদেশি অ্যাকাউন্টগুলিকে সুকৌশলে ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কমিশনের তরফ থেকে এই ধরনের বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, বিধান পরিষদের চিফ হুইপ জনক রাম জানান, বাঁকিপুরের মানুষ উন্নয়ন ও সুশাসনের পক্ষেই নিজেদের রায় দেবেন। বাইরের লোক এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে যে ভুল তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে, তা সাধারণ ভোটাররা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারছেন। আদর্শ আচরণবিধি (Model Code of Conduct) এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (Representation of the People Act) লঙ্ঘনের দায়ে নির্বাচন কমিশনকে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছে বিজেপি।


‘ভয়ে কাঁপছে বিজেপি’, পাল্টা তোপ জন সুরাজের
বিজেপির তোলা এই সমস্ত অভিযোগের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে প্রশান্ত কিশোরের দল জন সুরাজ পার্টি। দলের বিহার রাজ্য সভাপতি মনোজ ভারতী ‘দ্য হিন্দু’-কে দেওয়া একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, “এর আগে বিজেপি কখনও জন সুরাজকে তাদের লড়াইয়ের ময়দানে ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনি। তারা সবসময় দাবি করত যে তাদের সরাসরি লড়াই শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (RJD) সঙ্গে। কিন্তু আজ বিজেপি নেতাদের এই প্রবল উদ্বেগ ও হতাশা এটাই প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, তাঁরাও মনে মনে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, আসল লড়াইটা জন সুরাজের সঙ্গেই হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “কমিশনের কাছে তারা আমাদের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ঠিক কী ধরনের প্রমাণ জমা দিয়েছে, তা আমরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাই। মূলত, বিজেপির এই পুরো আচরণটাই অত্যন্ত শিশুসুলভ। তারা যদি আমাদের তহবিলের উৎস বা ফান্ডিং নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তবে সবার আগে নিজেদের তহবিলের সম্পূর্ণ হিসেব প্রকাশ্যে আনুক। তারা এই নির্বাচনে এখনও পর্যন্ত কত টাকা খরচ করেছে, সেই হিসেব আগে দিক।”


### আসন্ন নির্বাচন ও রাজনৈতিক সমীকরণ
বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে এবার এক হাড্ডাহাড্ডি ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জন সুরাজ পার্টির হয়ে খোদ প্রশান্ত কিশোর ময়দানে নামায় এই নির্বাচন সর্বভারতীয় স্তরেও নজর কেড়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী করেছে নীরজ কুমার সিনহাকে। অন্যদিকে, আরজেডি-র টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রেখা কুমারী। আগামী ৩০ জুলাই এই কেন্দ্রে বহু প্রতীক্ষিত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে এবং আগামী ৩ আগস্ট ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply