পরীক্ষার নামে প্রহসন রাজস্থানে: প্রশ্ন ফাঁস ও দুর্নীতির জালে যুবসমাজের ভবিষ্যৎ, ক্ষোভের আগুন সোশ্যাল মিডিয়ায়

AI Generated Image

৩০ জুন, ২০২৬

জয়পুর: রাজস্থানের সরকারি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ব্যবস্থায় লাগাতার জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের (পেপার লিক) ঘটনা এবার চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি ‘অভিনয় ম্যাথস’ নামের একটি জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ওই পোস্টে রাজস্থানের ভঙ্গুর পরীক্ষা ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে বলা হয়েছে, “রাজস্থানে আবার পরীক্ষায় ধান্ধলেবাজি! যুবকদের সঙ্গে সবচেয়ে বড় অন্যায় এটাই যে, তাদের ভবিষ্যৎ বিক্রি করছে সেইসব লোক, যাদের হাতে এর রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।” পোস্টটি ইতিমধ্যেই লাখ লাখ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকটকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।

পরীক্ষা কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা ও শিক্ষার্থীদের কান্না

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক ভয়াবহ চিত্র। পরীক্ষা কেন্দ্রের ছাদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রশ্নপত্র, উল্টে পড়ে আছে চেয়ার। বহুতল ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শত শত শিক্ষার্থীর চোখে-মুখে চরম উদ্বেগ। অনেক পরীক্ষার্থীকে হতাশায় কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জয়পুরের প্যারামেডিক্যাল কাউন্সিল পরীক্ষায় একটি বড় ধরনের চিটিং র‌্যাকেট ধরা পড়ার পর পরীক্ষা কেন্দ্রে এই নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এই ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অভিযোগ, এই চক্রটি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে অবৈধ উপায়ে পাস করানোর দায়িত্ব নিয়েছিল।

সিকরের ‘কোচিং হাব’ থেকে NEET বিতর্ক: দুর্নীতির পুরোনো ইতিহাস

রাজস্থানে পরীক্ষার এই অনিয়ম নতুন কিছু নয়। এর আগে NEET-UG 2026 পরীক্ষায় দেশজুড়ে যে বিশাল প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছিল, তার সূত্রপাতও হয়েছিল রাজস্থানের সিকর (Sikar) সংলগ্ন কোচিং হাব থেকে। সেই সময় এক শিক্ষকের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ‘গেস পেপার’-এর সাথে মূল প্রশ্নপত্রের প্রায় ১৪০টি প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গিয়েছিল, যা সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ও দেশব্যাপী তীব্র প্রতিবাদের মুখে সেই পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এই ঘটনার সিবিআই (CBI) তদন্ত চলছে। সচেতন মহলের অভিযোগ, রাজস্থানের মতো রাজ্যে যেখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার চাপ অত্যধিক, সেখানে নামী-দামী কোচিং সেন্টারগুলোর সাথে দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশ এখন ওপেন সিক্রেট।

মেধার অবমাননা ও বিপন্ন যুবসমাজ

বছরের পর বছর দিনরাত এক করে পড়াশোনা করা সৎ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনকে এই ধরনের কেলেঙ্কারি পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। মেধা ও পরিশ্রমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একদল অসাধু চক্র টাকার বিনিময়ে আসন বিক্রি করছে। শিক্ষাকে পুরোপুরি ব্যবসায় পরিণত করার এই প্রবণতা পুরো ব্যবস্থাকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন—যারা পরীক্ষার সুরক্ষার দায়িত্বে আছেন, তারাই যদি চোরদের সাথে হাত মেলান, তবে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা কার কাছে বিচার চাইবে?

কঠোর পদক্ষেপ ও সংস্কারের দাবি

শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, এই ধরনের ঘটনা দেশের যুবশক্তিকে চরম হতাশায় নিমজ্জিত করছে। যখন মেধার চেয়ে টাকা ও রাজনৈতিক সুপারিশ বড় হয়ে ওঠে, তখন দেশের ভবিষ্যৎই সংকটে পড়ে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজস্থান সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের দাবি:

  • ডিজিটাল নিরাপত্তা: প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও ডিজিটাল নজরদারিতে আনতে হবে।
  • কোচিং সেন্টারে লাগাম: সিকরের মতো বড় বড় কোচিং হাবগুলোর আর্থিক লেনদেন ও কার্যক্রমের ওপর কড়া নজরদারি চালাতে হবে।
  • ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট: পেপার লিক ও জালিয়াতির সাথে যুক্ত অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তদন্ত কমিশন গঠন করে বা কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে এই ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়। শিক্ষাকে লাভের মাধ্যম হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। রাজস্থানের এই ঘটনা শুধু একটি রাজ্যের সমস্যা নয়, বরং এটি গোটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের কঙ্কালটিকে উন্মোচিত করেছে। সময় এসেছে দ্রুত কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার, অন্যথায় লক্ষ লক্ষ যুবকের স্বপ্ন এভাবেই বারবার ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply