নয়াদিল্লি, ২৭ আগস্ট:
ভারতের বিচারবিভাগীয় ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনায় রাজস্থান হাইকোর্টের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব প্রকাশ শর্মার অপসারণ দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সন্দীপ মেহতা। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে লেখা পরপর তিনটি চিঠিতে তিনি এই আর্জি জানিয়েছেন। চিঠিতে রাজস্থান হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপোষণ এবং দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। আগামী মাসেই অবসর নেওয়ার কথা বিচারপতি শর্মার। তার আগে তাঁকে অবিলম্বে অন্য কোনও রাজ্যে বদলি করে রাজস্থান হাইকোর্টে একজন স্থায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের দাবি তুলেছেন বিচারপতি মেহতা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট, ১০ আগস্ট এবং ১৭ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে এই চিঠিগুলি দেওয়া হয়েছে। চিঠির অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়ামের অন্যান্য সদস্য এবং ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছেও পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বিচারপতি মেহতা অভিযোগ করেছেন যে, বিচারপতি শর্মা গত দশ মাস ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে রয়েছেন এবং এই সময়ে তিনি ব্যাপকভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। মাস্টার অফ দ্য রোস্টার হিসেবে নিজের প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে তিনি বেছে বেছে নির্দিষ্ট কিছু মামলা নিজের বেঞ্চে সরিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী এবং বিত্তশালীদের সুবিধা পাইয়ে দিতেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে চিঠিতে দাবি করা হয়েছে।
বিচারপতি মেহতা তাঁর চিঠিতে একটি বিশেষ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন যা আইনি মহলে ব্যাপক চর্চার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর একটি বেঞ্চ অন্য একটি মামলার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছিল যে, অবসরের ঠিক আগে কিছু বিচারপতির মধ্যে নিয়মবহির্ভূত নির্দেশ দেওয়ার বা ছক্কা হাঁকানোর একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সেই প্রসঙ্গ টেনেই বিচারপতি মেহতা তাঁর চিঠিতে লিখেছেন যে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিচারপতি শর্মা যেন ছক্কা হাঁকানোর লাইসেন্স পেয়ে গিয়েছেন।
চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, বিচারপতি শর্মা তাঁর সহকর্মী বিচারপতিদের প্রায়শই বদলি সহ বিভিন্ন প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে থাকেন। উদয়পুরের কিছু বহুমূল্য জমির মামলা জোধপুর বেঞ্চ থেকে জয়পুর বেঞ্চে নিজের কাছে সরিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট উদাহরণও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও, লোক আদালতে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপোষণের অভিযোগও সামনে আনা হয়েছে। অভিযোগ, জয়পুর মেট্রো নম্বর ওয়ানের এক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তিনি নিজের বাল্যবন্ধু এবং মেয়ের শ্বশুরকে নিয়োগ করেছেন।
বিচারপতি সঞ্জীব প্রকাশ শর্মা ২০১৬ সালের নভেম্বরে রাজস্থান হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে পাটনা হাইকোর্টে বদলি করা হয়। এরপর ২০২৩ সালের মার্চ মাসে তিনি স্বাস্থ্যের কারণে রাজস্থানে ফিরে আসার আবেদন জানালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন কলেজিয়াম তা খারিজ করে তাঁকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে বদলি করে। তবে ২০২৫ সালের মে মাসে তাঁকে পুনরায় রাজস্থান হাইকোর্টে ফিরিয়ে আনা হয় এবং পরে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পান।
বিচারপতি মেহতা নিজে একসময় রাজস্থান হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, বিচারপতি শর্মাকে স্থায়ী প্রধান বিচারপতি করার জন্য একটি চেষ্টা চলছে, যা বিচারবিভাগের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। তাই অবিলম্বে অন্য কোনও রাজ্য থেকে একজন বিচারপতিকে রাজস্থানের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের আর্জি জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন যে বিচারপতি মেহতার তোলা অভিযোগগুলি যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

