নয়া দিল্লি, ২৫ সেপ্টেম্বর: দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যম প্রকাশিত তদন্তমূলক প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির যে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছিল, তার ওপর ভিত্তি করেই এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার আইনজীবী শৈলেন্দ্র মানি ত্রিপাঠী সুপ্রিম কোর্টে এই মামলাটির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে।
মামলাকারীর প্রধান অভিযোগ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে এমন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যেগুলির ক্ষেত্রে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী এবং সুখবীর সিং সঁধুর মতামত সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত দশ মাসের মধ্যে অন্তত চৌদ্দবার দুই কমিশনার লিখিতভাবে কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশিকা নিয়ে নিজেদের দ্বিমত ও আপত্তি নথিভুক্ত করেছিলেন।
এই পুরো প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে মামলাকারী আদালতে আবেদন জানিয়েছেন যে, জ্ঞানেশ কুমারের এককভাবে নেওয়া সমস্ত সিদ্ধান্ত, জারি করা নির্দেশিকা এবং ভোটার সংক্রান্ত সফটওয়্যারে করা পরিবর্তনগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হোক। শুধু তাই নয়, ওই সিদ্ধান্তগুলিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে তা বাতিল করার জোরালো দাবিও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, ভোটার তালিকায় নতুন নাম নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে পুরোনো ফর্ম-৬ ফিরিয়ে আনার আর্জিও রাখা হয়েছে।
বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া চলাকালীন ভোটার তালিকায় ব্যাপক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলেছেন মামলাকারী। তাঁর দাবি, এই প্রক্রিয়ার আওতায় দেশের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। এত বিপুল সংখ্যক নাগরিকের নাম কীভাবে তালিকা থেকে বাদ গেল, তার নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট (SIT) গঠনের আবেদন জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি, এই মামলায় শুধুমাত্র মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নন, বরং সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ এবং নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্নার বিরুদ্ধেও জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩২ নম্বর ধারায় অভিযোগ এনে যথাযথ তদন্তের আবেদন করা হয়েছে।
আইনজীবী ও মামলাকারীর যুক্তিতে উঠে এসেছে যে, ২০২৩ সালের নতুন আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনারদের সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিশেষ আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। তবে কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মতপার্থক্য দেখা দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে প্রাধান্য দেওয়ার সাংবিধানিক নিয়ম লঙ্ঘিত হয়ে থাকলে, সেই বিশেষ আইনি সুরক্ষা আর প্রযোজ্য হতে পারে না বলেও দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এই সমস্ত অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, গত এক বছরের সমস্ত নীতিগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে। কমিশনের দাবি, দুই নির্বাচন কমিশনারের নথিভুক্ত মতামতকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামগ্রিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
এর আগে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষ থেকেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের জোরালো দাবি তোলা হয়েছিল এবং সংসদের উভয় কক্ষে প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি চলছে। এখন এই পুরো আইনি ও প্রশাসনিক বিতর্ক সুপ্রিম কোর্টের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর পর দেশের সর্বোচ্চ আদালত কী রায় দেয় বা কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই নজর রয়েছে গোটা দেশের ওয়াকিবহাল মহলের।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
