বুলডোজারের বাংলায় এক লাল পতাকা

একটি বিধানসভার আসন দিয়ে বিরোধিতার মাপকাঠি হয় না। মাপকাঠি হয়, ক্ষমতা যখন মানুষের জীবন থেকে জল, রুটি ও পদচিহ্ন কেড়ে নিতে চায়, তখন কে রাস্তায় দাঁড়ায়।

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্র পালটে গেছে। বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূল কংগ্রেস, যে দল দেড় দশক রাজ্য শাসন করেছে, সংখ্যায় এখনও বিধানসভার বৃহত্তম বিরোধী শক্তি, কিন্তু সেই সংখ্যা আর এক দলের নয়। সিপিআই(এম) ফিরেছে মাত্র একটি আসন নিয়ে; ডোমকলের মুস্তাফিজুর রহমান রানা। কংগ্রেস দুটি। এই হিসাব দেখে অনেকেই বলবেন, বামপন্থা এখন প্রায় প্রতীকী। অথচ রাস্তায়, ফুটপাথে, বস্তিতে যে রাজনীতি চলছে, সেখানে হিসাব উল্টে যায়। এক বিধায়ক ও একটি সংগঠিত আন্দোলনের দল, ক্ষমতাহীন হয়েও, অনেক সময় বাকি বিরোধী শিবিরের চেয়ে বেশি করে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে।

রেজিনগরের সিপিআইএম প্রার্থী সাইদ এর সমর্থনে ভোট প্রচারে দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম

এ কথা কোনো দলীয় স্তব নয়। এ কথা এই রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক নৈতিকতার হিসাব। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর যে নীতি দ্রুত চেনা গেল, তার নাম অনেকেই দিয়েছেন ‘বুলডোজার রাজ’। নিউ মার্কেট, হাওড়া, দমদম, যাদবপুর রেলস্টেশনের ধার ও শহরের ফুটপাথ থেকে হকারদের উচ্ছেদ শুরু হয় পুনর্বাসনের কোনো স্পষ্ট রূপরেখা ছাড়াই। মুখ্যমন্ত্রীর যুক্তি সোজা: ফুটপাথ পথচারীর; জবরদখলের অধিকার কারও নেই; তিনি বৃহত্তর জনগণের কাছে দায়বদ্ধ, একটি গোষ্ঠীর কাছে নয়। রাজাবাজার, খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজের দৃষ্টান্ত তিনি নিজেই টেনেছেন। যুক্তিটি শহর-পরিকল্পনার ভাষায় শোনায় পরিচ্ছন্ন। কিন্তু যে শহরে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিই লক্ষ লক্ষ মানুষের একমাত্র ভরসা, সেখানে বুলডোজার এলে প্রথমেই ভেঙে পড়ে গরিবের রোজগার।

এই জায়গায় সিপিআই(এম) দেরি করেনি। যাদবপুর স্টেশনে রাতের অভিযানের মুখে রুখে দাঁড়ান বাম নেতাকর্মীরা; কিছু সময়ের জন্য বুলডোজার পিছু হটে। কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের হকারদের উপর চাপ নামলেও প্রতিবাদ হয়। নেতা গ্রেফতার হন, লাঠি চলে, তবু দাবি একই থাকে উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন, ১৯৮৮-এর হাইকোর্ট রায় ও স্ট্রিট ভেন্ডর্স আইনের মর্যাদা। সিপিআইএম মহম্মদ সেলিম স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেন: আইনশৃঙ্খলার নামে বুলডোজার ও সতর্কতাহীন জবরদস্তি পশ্চিমবঙ্গকে সেই পথে নিয়ে যাবে, যার বিরুদ্ধে মানুষ আগের সরকারকেও বিদায় দিয়েছে। পরে মমতা ব্যানার্জিও এসপ্ল্যানেডে মিছিল করেন। কিন্তু সময়ের হিসাবে, এবং মাঠের হিসাবে, প্রথম প্রতিরোধ গড়ে ওঠে বামপন্থী ইউনিয়ন ও ছাত্র-যুবদের হাতে যখন তৃণমূল নিজেই পরাজয়ের ধাক্কায় ভেঙে পড়ছিল।

জ্যোতিনগরে সিপিআইএম নেত্রী মীনাক্ষী

আরও নির্মম ছবি কাশীপুর-বেলগাছিয়ার জ্যোতিনগর কলোনিতে। গঙ্গার কিনারে প্রায় ছয় দশকের এই বসতি, স্থানীয় মুখে ‘মোল্লাপাড়া’, প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বাস অধিকাংশ মুসলিম, দিনমজুর, কাচগলা কারখানার শ্রমিক। ২৯ জুলাই রাতের পর পাঁচ-ছয়টি সরকারি কল থেকে জল আসা বন্ধ হয়ে যায়। পাশের হিন্দুপ্রধান পাড়ায় জল চলে; এই একশো-দেড়শো মিটারের ফিতে জল নেই। শিশুরা ঘোলা গঙ্গায় নাইতে নামে, চর্মরোগ ছড়ায়, মহিলারা রাতের অন্ধকারে নদীতে যান। প্রশাসনের অজুহাত দুটো – কলকাতা পুরসভার পাইপলাইন মেরামত, আর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পোর্টের জমি, যেখানে বাসিন্দারা ‘অবৈধ দখলদার’। অর্থাৎ জল বন্ধ করা হয় নাগরিক সেবা হিসেবে নয়, উচ্ছেদের চাপ হিসেবে।

এখানেই রাজনীতি নগ্ন হয়। স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারির মুখে বাসিন্দারা শোনেন, মুসলিমরা তাঁকে ভোট দেয়নি বলে তিনি পাঁচ বছর তাঁদের জন্য কাজ করবেন না শপথ বাবা ভোলানাথের নামে। জল ফেরানোর অনুরোধে তিনি বলেন, জমি বন্দরের, জল পুরসভার, বিষয় আদালতে। মুখ্যমন্ত্রীর বৃহত্তর নীতিও একই সুরে বাজে: একটি জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বৃহত্তর জনস্বার্থের ওপরে উঠতে পারে না। কিন্তু জল কি গোষ্ঠীস্বার্থ? না কি মৌলিক অধিকার? সিপিআই(এম) নেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় কলোনিতে যান, প্রতিবাদ করেন। পশ্চিমবঙ্গ বস্তি উন্নয়ন সমিতি ও স্থানীয় বাম শাখা নিজেদের পয়সায় পুরসভার জলের গাড়ি ভাড়া করে সাত-আটশো টাকায় এক ট্যাঙ্ক, তিন-চার দিন অন্তর, পাঁচ হাজার মানুষের জন্য যা কিছুই নয়। তবু কেউ যেন না বলে, এই মানুষগুলো একা পড়েছিল। হাইকোর্ট উচ্ছেদে স্থগিতাদেশ দেয়; জল ফেরেনি। একটি দল, যার বিধানসভায় মাত্র একজন প্রতিনিধি, সেখানেও ট্যাঙ্কার পাঠায়। যে দলগুলোর বিধায়ক সংখ্যা এর বহুগুণ, তাঁদের উপস্থিতি সেই তুলনায় ক্ষীণ।

এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয় তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখলে। নির্বাচনী পরাজয়ের পর প্রায় আশি জন বিধায়কের দল ভেঙে যায়। প্রায় ষাটজন ঋতাব্রত ব্যানার্জির পেছনে, প্রায় বিশজন মমতার শিবিরে। নেতা প্রতিপক্ষের স্বীকৃতি, দলের নাম ও প্রতীক নিয়ে লড়াই চলে দিল্লিতে। নির্বাচন কমিশন ‘ফুল-ঘাস’ প্রতীক স্থগিত করে; এক পক্ষ হয় মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস, প্রতীক ফুটবল খেলোয়াড়; অন্য পক্ষ ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস, প্রতীক খাম। যে দল একসময় রাজ্যের প্রায় প্রতিটি গ্রামে পতাকা পুঁতেছিল, সেই দল এখন নিজের নামটুকু নিয়ে আদালত ও কমিশনের দোরগোড়ায়। মানুষের জল ও হকারের রোজগার সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে নেই। দুই তৃণমূল এখন নিজেদের বৈধতা প্রমাণে ব্যস্ত; জনগণের বৈধতা অর্থাৎ বাঁচার অধিকার সেখানে গৌণ।

কংগ্রেসের ছবি আলাদা, কিন্তু স্বস্তিদায়ক নয়। রাহুল গান্ধী জাতীয় মঞ্চে যে ছাপ রাখছেন, পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতৃত্ব তা ধরে রাজ্যজুড়ে সংগঠন গড়তে পারেননি। অধীর রঞ্জন চৌধুরী মুর্শিদাবাদে এখনও এক ধরনের ব্যক্তিগত দুর্গ রক্ষা করেন; রেজিনগরের মতো আসনে তাঁর কণ্ঠস্বর শোনা যায়। কিন্তু বাকি বাংলায় কংগ্রেস প্রায় অনুপস্থিত। নেতৃত্বের সংকট, সংগঠনের দৈন্য, এবং তৃণমূলের ছায়া থেকে বেরোতে না-পারার পুরনো অভ্যাস। সুযোগ এসেছে, স্বীকার করেন অধীর নিজেই; কাজে লাগানো যায়নি সেই সুযোগ। ফলে বিরোধিতা হয়ে ওঠে বিবৃতি, মিছিল নয়; আসন রক্ষা, অধিকার রক্ষা নয়।

হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি এই চিত্রের আরও এক স্তর। তৃণমূল থেকে বরখাস্ত হয়ে তিনি ২০২৫-এর শেষে দল গড়েন, বাবরি-ধাঁচের মসজিদের আবেগ ও সংখ্যালঘু অধিকারের ভাষা নিয়ে। নির্বাচনের আগে তাঁর বক্তব্য একরৈখিক ছিল না। কখনও বলেছেন তৃণমূল ও বিজেপি দুইকেই রুখবেন; কখনও বলেছেন আরএসএস-মার্কা শাসনের চেয়ে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীকে তিনি স্বাগত জানাবেন; কখনও দাবি করেছেন ২০২৬-এ কেউ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, হুমায়ুন ছাড়া কেউ শপথ নিতে পারবেন না। এর পাশাপাশি যে স্টিং ভিডিও ঘিরে বিতর্ক ওঠে যাতে তিনি বিজেপির সঙ্গে গোপন বোঝাপড়া, আসন ভাগাভাগি ও সরকার গঠনের কথা বলছেন বলে অভিযোগ, তিনি সেটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জাল বলে উড়িয়ে দেন। অভিযোগ প্রমাণিত নয়; কিন্তু রাজনৈতিক পরিণতি প্রমাণের অপেক্ষা রাখেনি। এআইএমআইএম জোট ছাড়ে। সংখ্যালঘু ভোটের একাংশ তৃণমূল থেকে সরে তাঁর দিকে যায়। রাজ্যজুড়ে সেই ভাঙন বিজেপির পথ পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। যদিও নিজের দুই আসন নওদা ও রেজিনগরে তিনি বিজেপিকেই হারান।

নওদা কেন্দ্রের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর, বিজেপির সাথে হাজার কোটির ডীল নিয়ে আলোচনা করার ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট

এখানেই নির্ণায়ক রাজনীতির ফাঁদ। যে নেতা নিজেকে সম্প্রদায়ের ঢাল বলে উপস্থাপন করেন, তাঁর কৌশল যদি শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিকেই সুবিধা দেয় যার বিরুদ্ধে তিনি মঞ্চে দাঁড়ান, তবে প্রশ্ন ওঠে তিনি মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, না ব্যবহার করছেন? রেজিনগর তিনি খালি রেখেছেন নওদা রাখার হিসাবে। এখন সেই আসনে তাঁর দল, দুই তৃণমূল, কংগ্রেস, বিজেপি ও সিপিআই(এম) মুখোমুখি। ভোটার যদি শুধু পরিচিত মুখ দেখেন, তবে খেলা আগের মতোই চলবে। যদি দেখেন কে তাঁদের জল-রোজগার-সম্মান নিয়ে রাস্তায় আছে আর কে তাঁদের ভোটকে দরদাম করে ক্ষমতার সিঁড়ি বানায়, তবে পছন্দ বদলাতে পারে। যে মানুষকে ব্যবহার করে, তার কাছে মানুষ একবারই মূলধন; যে মানুষের জন্য কাজ করে, তার কাছে মানুষ বারবার ফিরে আসে।

এই পটভূমিতেই আসছে ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচন – নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর। নন্দীগ্রাম খালি হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুর রেখে এই আসন ছাড়ায়; রেজিনগর খালি হয়েছে হুমায়ুন কবীর নওদা রাখায়। দুই আসনই প্রতীকী। একদিকে ক্ষমতাসীন দলের প্রথম জন রায়, অন্যদিকে ভাঙা তৃণমূলের দুই শিবির, কংগ্রেস, বামফ্রন্ট। নন্দীগ্রামে সিপিআই প্রার্থী শান্তিগোপাল গিরি, রেজিনগরে সিপিআই(এম) প্রার্থী সৈয়দ আসাদ আলি। জয়ের গণিত সহজ নয়। কিন্তু উপনির্বাচন শুধু জয়-পরাজয়ের অঙ্ক নয়; এ এক প্রশ্নও বটে ভোটার কি শুধু বড় দলের প্রতীক দেখবেন, না কি দেখবেন কে ফুটপাথে হকারের পাশে দাঁড়িয়েছিল, কে জ্যোতিনগরে ট্যাঙ্কার পাঠিয়েছিল, কে বুলডোজারের সামনে গ্রেফতার হয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দেখেছে, ক্ষমতা বড় হলেও বিরোধিতা ছোট হতে পারে, আর সংখ্যা ছোট হলেও বিরোধিতা বড় হতে পারে। বামপন্থার ইতিহাস এই রাজ্যে জটিল; উজ্জ্বল ও দাগযুক্ত দুই-ই। কিন্তু আজকের প্রশ্ন সেই ইতিহাসের পুনর্বাসন নয়। আজকের প্রশ্ন আরও সরল। যখন সরকার বলে ফুটপাথ পথচারীর, তখন কে জিজ্ঞাসা করে, হকার কি পথচারী নয়? যখন বন্দরের কাগজে মানুষ অবৈধ, তখন কে জিজ্ঞাসা করে, দুই প্রজন্ম ধরে থাকা পরিবারকে জল বন্ধ করে উচ্ছেদ কি আইন, না কি শাস্তি? যখন বিধায়ক বলেন তিনি একটি সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করবেন না, তখন কে সেই বাক্যকে শাসনের নীতি হতে দেয় না?

একটি আসন নিয়ে সিপিআই(এম) এই প্রশ্নগুলো রাস্তায় তুলছে। বাকি বিরোধী শিবির ভাঙা তৃণমূল ও ছড়িয়ে-পড়া কংগ্রেস অনেক সময় নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই ব্যস্ত। রেজিনগর ও নন্দীগ্রামের ভোটার যদি এই ফারাকটি চোখে দেখেন, তবে তা কোনো দলের জয় হবে না শুধু। তা হবে এই স্বীকৃতি যে, গণতন্ত্রের বিরোধীপক্ষ আসন গোনে না, মানুষ গোনে। আর মানুষ গোনা মানে জল গোনা, রোজগার গোনা, সম্মান গোনা। যে দল সংখ্যায় ক্ষুদ্র হয়েও সেই হিসাব রাখে, ইতিহাস তাকে প্রায়ই মনে রাখে ক্ষমতার হিসাব খাতায় না হলেও, মানুষের স্মৃতিতে।

রেজিনগরে প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ। হুমায়ুন কবীর যে আসন জিতে ছেড়েছেন, সেখানে মানুষ কি আবার সেই রাজনীতিতে ভোট দেবেন যা তাঁদের পরিচয়কে হাতিয়ার করে, না কি এমন শক্তিকে বিবেচনা করবেন যারা সংখ্যায় ছোট হয়েও হকারের ফুটপাথ ও জ্যোতিনগরের কল নিয়ে মাঠে আছে? নন্দীগ্রাম ইতিহাসের প্রতীক; রেজিনগর এবার বিশ্বাসের পরীক্ষা।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply