বাপের বাড়ি যেতে স্বামীর অনুমতি কেন? বিয়ে নিয়ন্ত্রণের লাইসেন্স নয়, পর্যবেক্ষণ কর্হাণাটক হাইকোর্টের

বাপের বাড়ি যেতে স্বামীর অনুমতি কেন? বিয়ে নিয়ন্ত্রণের লাইসেন্স নয়, পর্যবেক্ষণ  কর্হাণাটক হাইকোর্টের

বেঙ্গালুরু, ৩ সেপ্টেম্বর:

বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য স্বামীর অনুমতি নিতে হবে কেন, কিংবা নিজের বাবা-মাকে দেখতে যাওয়ার জন্য কেন শ্বশুরবাড়ির সম্মতির প্রয়োজন হবে? বিবাহিত নারীদের অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা সংক্রান্ত এক তাৎপর্যপূর্ণ মামলায় এই প্রশ্ন তুলল কর্নাটক হাইকোর্ট। আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করার জন্য স্ত্রীকে বাধ্য করতে পারেন না স্বামী। বিয়ে কখনোই কারও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা বা দমিয়ে রাখার লাইসেন্স নয়।

পারিবারিক আদালতের একটি নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কর্নাটক হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সতীশ নামের এক ব্যক্তি। পারিবারিক আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, আবেদনকারীকে তাঁর স্ত্রী ও নাবালিকা সন্তানের ভরণপোষণের জন্য প্রতি মাসে মোট ৯ হাজার টাকা (স্ত্রীর জন্য ৫ হাজার ও সন্তানের জন্য ৪ হাজার টাকা) খোরপোশ হিসেবে দিতে হবে। এর আগে স্ত্রী তাঁর ও সন্তানের জন্য প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা খোরপোশ দাবি করেছিলেন। তবে নিম্ন আদালতের ওই ৯ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ পুনর্বিবেচনা এবং টাকার অঙ্ক কমানোর আর্জি জানিয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন স্বামী।

হাইকোর্টে শুনানির সময় ওই ব্যক্তি দাবি করেন, তাঁর স্ত্রী নিজের ইচ্ছায় শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছেন এবং শ্বশুরবাড়ির কোনও দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি আরও দাবি করেন, তিনি দিনমজুরি বা কুলির কাজ করে সংসার চালান, ফলে ওই পরিমাণ অর্থ খোরপোশ দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যদিকে, স্ত্রীর অভিযোগ ছিল, বৈবাহিক জীবনে তিনি ক্রমাগত হেনস্থার শিকার হয়েছেন। স্বামী মদ্যপান করতেন এবং কারণে-অকারণে তাঁর উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন।

স্বামীর পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে তাঁর স্ত্রী বারবার শ্বশুরবাড়ির অনুমতি না নিয়েই বাপের বাড়ি চলে যেতেন। এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিচারপতি চিল্লাকুর সুমালথা। বিচারপতি পর্যবেক্ষণ করে জানান, আদালত এটা বুঝতে অক্ষম যে একজন ভারতীয় নারীকে তাঁর বাবা-মায়ের বাড়ি যাওয়ার সাধারণ ইচ্ছাটুকু পূরণ করার জন্য কেন শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকের অনুমতি নিতে হবে।

বিচারপতি আরও স্পষ্ট করেন, শ্বশুরবাড়ির কোনও সদস্য কিংবা স্বামী নিজেও কোনও নারীকে একার দায়িত্বে ঘরের যাবতীয় কাজকর্ম করা অথবা শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করার জন্য বাধ্য করতে পারেন না। আদালতের মতে, বাবা-মাকে দেখাশোনা ও সেবা করার প্রাথমিক দায়িত্ব সন্তান অর্থাৎ পুত্র বা কন্যার উপর বর্তায়, পুত্রবধূ বা জামাইয়ের উপর নয়। পুত্রবধূ বা জামাইয়ের ক্ষেত্রে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে তাঁদের নিজস্ব ইচ্ছাধীন হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই বলপূর্বক বা বাধ্যতামূলক হতে পারে না। ঘরের কাজও স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে সমানভাবে ভাগাভাগি হওয়া উচিত।

নারীর অধিকার ও স্বাধিকার প্রসঙ্গে হাইকোর্ট আরও মন্তব্য করে যে, একজন মহিলার নিজের কর্মজীবন ও আর্থিক বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মৌলিক অধিকার রয়েছে। স্বামী কোনো বিষয়ে স্ত্রীকে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী চলার জন্য জোর করতে পারেন না। বিয়ে কখনোই অন্য কারও স্বাধীনতা ও ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ, শাসন, দমন বা জয় করার ছাড়পত্র বা লাইসেন্স হতে পারে না।

সমস্ত তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে পারিবারিক আদালতের নির্দেশে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করে কর্নাটক হাইকোর্ট। আদালত জানিয়ে দেয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্ত্রী ও সন্তানের জন্য ধার্য করা এই ন্যূনতম আর্থিক সহায়তা বজায় রাখা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত। ফলে স্বামীর পুনর্বিবেচনার আবেদনটি খারিজ করে আগের নির্দেশই বহাল রাখা হয়।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply