মালদহ, ২৬ জুলাই: মালদহের ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদের নিকটবর্তী স্থানে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিল একাধিক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তঘেঁষা জেলা মালদহে পুনরায় উস্কে উঠল মন্দির-মসজিদ সংক্রান্ত পুরোনো বিতর্ক। এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও রাজনৈতিক আবহে এই ঘটনা নতুন করে চরম চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলির দাবি, এই স্থানে অতীতে প্রাচীন মন্দির বিদ্যমান ছিল, যার ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করাই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। অন্যদিকে, স্থানীয় প্রশাসন ও একাংশের সমাজকর্মীরা এই পদক্ষেপের ফলে এলাকায় রাজনৈতিক এবং সামাজিক মেরুকরণ বাড়তে পারে বলে তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সংবাদসূত্রে খবর, একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক আবহেও রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যকে কেন্দ্র করে সংঘাতের বাতাবরণ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছ কয়েকটি ডানপন্থী সংগঠন। ঐতিহ্যবাহী আদিনা মসজিদ প্রাঙ্গণের ঠিক পাশেই একটি স্থানে রীতি মেনে শিবলিঙ্গ স্থাপন ও পুজো অর্চনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির নেতাদের স্পষ্ট বক্তব্য, ঐতিহাসিক তথ্য ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী প্রাচীনকালে এই স্থানে শিব মন্দির অবস্থিত ছিল, যা পরবর্তীকালে ধ্বংস করা হয়। তাই সেখানে পুনরায় পুজো শুরু করা তাঁদের ধর্মীয় অধিকারের মধ্যেই পড়ে।
মালদহের পান্ডুয়ায় অবস্থিত আদিনা মসজিদ ভারতের চতুর্দশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (ASI)-এর অধীনে সুরক্ষিত এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের আশেপাশের অঞ্চলে এমন কোনো নতুন বিতর্কিত পদক্ষেপ যাতে উত্তেজনা না ছড়ায়, সে বিষয়ে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। জেলা পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে দেওয়া হবে না। যে কোনো রকম নিয়মবহির্ভূত জমায়েত বা উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
অপরদিকে, সংগঠনের এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তর্কাযুদ্ধ। বাম ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলির মতে, নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে বা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই এভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোকে বিতর্কিত করে তোলার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মূল সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতে রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায় থাকা কিছু গোষ্ঠী এই ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে দাবি সরব রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আদিনা মসজিদ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ইতিমধ্যেই বাড়তি পুলিশ বল মোতায়েন করা হয়েছে। থমথমে ভাব বজায় রয়েছে স্থানীয় বাজার ও আশেপাশের গ্রামগুলোতে। স্থানীয় নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশও বিষয়টিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, মালদহ জেলা আবহমান কাল ধরে সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত, সেখানে এই জাতীয় সিদ্ধান্ত অপ্রয়োজনীয় বিভাজন তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠার এই পরিকল্পনাকে ঘিরে মালদহ জেলায় নতুন করে শুরু হয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য রক্ষা বনাম রাজনৈতিক-ধর্মীয় দাবির দ্বন্দ্বে ভরা এক তীব্র বিতর্ক। জল কত দূর গড়ায়, এখন সে দিকেই নজর রাখছে ওয়াকিবহাল মহল।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
