একদা ঘাসফুলের একচ্ছত্র আধিপত্য, এবার চতুর্মুখী টানাটানি: সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশন রিপোর্ট সামনে এনে ২১ জুলাই নিয়ে ময়দানে বিজেপি !

একদা ঘাসফুলের একচ্ছত্র আধিপত্য, এবার চতুর্মুখী টানাটানি: সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশন রিপোর্ট সামনে এনে ২১ জুলাই নিয়ে ময়দানে বিজেপি !

কলকাতা, ২১ জুলাই: দীর্ঘ তিন দশক ধরে ২১ জুলাইয়ের ‘শহিদ দিবস’ ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের একচ্ছত্র শক্তি প্রদর্শনের বার্ষিক মঞ্চ। কিন্তু সময়ের চক্রে ও রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তনে ২০২৬ সালের এই ২১ জুলাই প্রত্যক্ষ করছে অভূতপূর্ব এক রাজনৈতিক টানাপোড়েন। একদিকে তৃণমূলের একাধিক উপদল ও কংগ্রেসের উত্তরাধিকারের দাবি, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় তদন্ত কমিশন রিপোর্ট পেশ— সব মিলিয়ে এককালের একক স্মারক অনুষ্ঠান এখন চতুর্মুখী লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত হয়েছে।

১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানের সময় তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ভোটার পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার দাবিতে আন্দোলন চলছিল। পুলিশি গুলিতে মৃত্যু হয় ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মীর। সেই ঘটনার পর থেকে বাম সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের চিহ্ন হিসেবে দিনটিকে ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে পালন করা শুরু হয়। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই দিনের উত্তরাধিকারকে নিজের দলের প্রধান রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপান্তর করেন। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই স্মৃতির ওপর এখন একাধিক শিবির নিজস্ব দাবি ঠুকছে।


তিন টুকরো তৃণমূল: কার নিয়ন্ত্রণে আসল ২১ জুলাই?
চলতি বছরে তৃণমূল কংগ্রেসের নিজস্ব বিভাজন শহিদ দিবসকে এক নজিরবিহীন জায়গায় নিয়ে গেছে।


১. ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠী:অধিকাংশ তৃণমূল বিধায়কের সমর্থন দাবি করে এবং নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি চেয়ে তারা মেয়ো রোডে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির পাদদেশে পৃথক সমাবেশের আয়োজন করেছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইলে এই মঞ্চে অভিভাবক বা ‘মার্গদর্শক’ হিসেবে যোগ দিতে পারেন।
২. মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল শিবির: ভিক্টোরিয়া হাউসের প্রথাগত স্থান না পেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে তারা বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের কাছে সভার আয়োজন করেছে। দলের নেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও বর্ষীয়ান নেতা কুণাল ঘোষের স্পষ্ট দাবি, ২১ জুলাইয়ের আন্দোলন ও মমতার ত্যাগ সমার্থক; একে তৃণমূলের থেকে আলাদা করা অসম্ভব।
৩. কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন ২০ জন সংসদ সদস্যের গোষ্ঠী: তারা সম্প্রতি ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়ার (NCPI) সাথে যুক্ত হয়ে সংসদ অধিবেশন চলায় দিল্লির রাজঘাটে শ্রদ্ধা নিবেদন কর্মসূচি পালন করছে।


‘ইতিহাস বিকৃতি’ ও কংগ্রেসের প্রত্যাবর্তন
অন্যদিকে, এই রাজনৈতিক ফাটলকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় কংগ্রেস তাদের হারানো জমি পুনরুদ্ধারে সরব হয়েছে। রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শহিদ মিনারের কংগ্রেসের সভায় আমন্ত্রণ জানিয়ে মন্তব্য করেন, অতীতে কংগ্রেস ত্যাগ করা যে ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, তা স্বীকার করে নিয়ে মমতার ঐতিহাসিক ভুল শুধরে নেওয়া উচিত। একই সাথে অধীর রঞ্জন চৌধুরী মুর্শিদাবাদের পলাশীতে যুব কংগ্রেসের র্যালি থেকে আরজিকর কাণ্ডের নির্যাতিতা চিকিৎসক এবং কালিগঞ্জের ১০ বছরের শিশু তামান্না খাতুনকে ‘শহিদ’ আখ্যা দিয়ে সুবিচারের দাবিতে সরব হন।


বিজেপির বড় পদক্ষেপ: সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশন রিপোর্ট
তবে এই সমস্ত রাজনৈতিক দড়িটানাকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্যের বর্তমান বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের তদন্ত কমিশন রিপোর্ট উপস্থাপন করে রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন।


শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, ২০১৪ ও ২০২৪ সালে রিপোর্ট জমা পড়া সত্ত্বেও তৎকালীন তৃণমূল সরকার তা চেপে রেখেছিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়নি। কমিশন প্রতি নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেছিল। বিজেপি সরকার জানিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে বকেয়া ক্ষতিপূরণ মেটানো হবে এবং পরিবারগুলোকে নতুন করে এফআইআর (FIR) করতে আইনি সহায়তা দেওয়া হবে। একই সাথে, ঘটনার সময় প্রধান প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি এবং মূল নথি কীভাবে গায়েব হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রশাসন।
সব মিলিয়ে, কলকাতা শহর আজ এমন এক ২১ জুলাই প্রত্যক্ষ করছে যেখানে একদিকে তৃণমূলের দলীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, কংগ্রেসের মূল ইতিহাস দাবির চেষ্টা এবং বিজেপির সরকারি রিপোর্টকে হাতিয়ার করে আইনি ও রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল একসঙ্গে মুখোমুখি।


বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply