চট্টগ্রামে সংখ্যালঘুর বাড়িতে আগুনে জড়িত শেখ হাসিনার আ.লীগ

চট্টগ্রামে সংখ্যালঘুর বাড়িতে আগুনে জড়িত শেখ হাসিনার আ.লীগ

ঢাকা ২২ শে জানুয়ারী : সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতঘরে আগুন দেওয়ার আগে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাড়ির মালিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ১৩ লাখ টাকা। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় একের পর এক বসতঘরে আগুন লাগানো হয়। গ্রেপ্তার আসামিদের স্বীকারোক্তি ও পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, সাবেক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে দেশে-বিদেশে অস্থিরতা তৈরির অংশ হিসেবেই এই অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে ভারতসহ আন্তর্জাতিক পরিসরে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

আমার দেশ লিখেছে যে গত সোমবার চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হারুনের আদালতে আসামি মনির হোসেনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। সেখানে তিনি জানান, মায়ের হত্যার বিচার চেয়ে প্রথমে তিনি স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার কাছে যান। ওই নেতা তাকে আশ্বাস দেন যে বিচার পাওয়া যাবে, তবে তার জন্য শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।

মনিরের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে তাকে রাঙামাটির এক আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কয়েকজন পেশাদার অপরাধীর সঙ্গেও তার যোগাযোগ করানো হয়, যারা মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ছিলেন।

জবানবন্দিতে মনির বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর অংশ হিসেবে হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বসতঘরে আগুন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিনিময়ে তাকে ১ লাখ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি রাঙামাটি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিনি অশিক্ষিত বলে জানালে তাকে বলা হয়, ‘হাসিনা ফিরে এলে শিক্ষিত হওয়া লাগবে না।’

মনির আরো জানান, রাউজানে প্রথম অগ্নিকাণ্ডের কয়েক দিন আগে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। সেখানে ওই পাঁচ বাড়ির মালিকপক্ষের কয়েকজনও উপস্থিত ছিলেন।

পরিকল্পনাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল, এসব ঘটনার মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে রাস্তায় নামানো এবং পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা। তারা আশা করেছিলেন, এসব ঘটনার প্রতিবাদ ভারতেও ছড়িয়ে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হবে, যার ফলে দ্রুত শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো সম্ভব হবে।

অগ্নিসংযোগের কৌশল সম্পর্কে মনির বলেন, আগুন দেওয়ার আগে বাড়ির লোকজনকে সতর্ক করা হতো, যাতে কেউ হতাহত না হয় এবং পোষা প্রাণী সরিয়ে নেওয়া যায়। বাড়ির বাইরে পুরোনো কাপড় ও লুঙ্গি রেখে আগুন লাগানো হতো। ক্ষতিপূরণ হিসেবে রাঙামাটির এক আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলরের মাধ্যমে আগেই ১৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়।

পুলিশ জানায়, গত ডিসেম্বর মাসে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় মোট পাঁচটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ১৮ ডিসেম্বর রাউজানের কেউটিয়া বড়ুয়াপাড়া গ্রামে সাধন বড়ুয়ার বসতঘর ও গোয়ালঘরে আগুন দেওয়া হয়। পরদিন ঢেউয়াপাড়া গ্রামে দুটি হিন্দু বসতঘরে এবং ২৩ ডিসেম্বর পশ্চিম সুলতানপুর গ্রামে সুখ শীল ও অনিলের বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

ঘটনাগুলোতে কেউ হতাহত না হলেও কয়েকটি ঘর আংশিক এবং কয়েকটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। ঘটনাস্থল থেকে উসকানিমূলক বক্তব্য সংবলিত ব্যানার উদ্ধার করা হয়, যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে উসকানিমূলক বক্তব্য, কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম এবং অর্ধশতাধিক মোবাইল নম্বর লেখা ছিল।

পুলিশ জানায়, প্রতিটি ঘটনায় মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেউ হতাহত হননি। প্রতিটি ঘটনার পরপরই পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন।

এ ঘটনায় রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানায় তিনটি মামলা করা হয়। তবে টাকার বিনিময়ে নিজের বাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঢেউয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বিমল তালুকদার। তিনি বলেন, গভীর রাতে আগুন লাগার পর বেড়া কেটে পরিবার নিয়ে বের হতে হয় এবং কেন আগুন দেওয়া হয়েছে, তা তিনি জানেন না। মনিরের স্বীকারোক্তির বিষয়টি জানানো হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি এবং টাকা নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন।

এদিকে, এ ঘটনায় মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আহসান হাবিব পলাশ। তিনি বলেন, রাতের আঁধারে এসব অগ্নিসংযোগ ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। এর মাধ্যমে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

গত ২ জানুয়ারি রাঙামাটি পার্বত্য জেলার কলেজগেট এলাকা থেকে মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাকি ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন— ওমর ফারুক, কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান ও মো. পারভেজ।

তাদের কাছ থেকে চারটি উসকানিমূলক ব্যানার, দুটি কেরোসিন তেলের কনটেইনার, একটি কেরোসিন তেলের বোতল, কেরোসিন তেলমাখা একটি লুঙ্গি ও একটি পুরোনো কালো শার্ট উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যানারে উল্লেখিত মোবাইল নম্বর সংরক্ষিত একটি মোবাইল ফোন, সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশা ও একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে, যা বিভিন্ন ঘটনাস্থলে যাতায়াতে ব্যবহৃত হয়েছিল।

আহসান হাবিব পলাশ আরও বলেন, ১৫–১৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জড়িত ছিল। পাশাপাশি জনমনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়াতে ষড়যন্ত্রমূলক ব্যানার টানানো হয়। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধ এবং প্রতিশোধমূলক মনোভাব থেকে ব্যানারে কিছু ব্যক্তির নাম ও মোবাইল নম্বর যুক্ত করা হয়।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply