‘চলো সংসদ’ অভিযানে উত্তাল রাজধানী: সংসদ ঘেরাওয়ের পর মোমেন্টাম ধরে রাখাই এখন সিজেপি-র আসল পরীক্ষা

‘চলো সংসদ’ অভিযানে উত্তাল রাজধানী: সংসদ ঘেরাওয়ের পর মোমেন্টাম ধরে রাখাই এখন সিজেপি-র আসল পরীক্ষা

নয়াদিল্লি, ২১ জুলাই: নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে চরম দুর্নীতির প্রতিবাদে সোমবার ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকে ‘চলো সংসদ’ অভিযানে আক্ষরিক অর্থেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে রাজধানী। বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনেই হাজার হাজার শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সাধারণ নাগরিক সংসদ ভবনের দিকে মার্চ করেন, যা সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় দিল্লি পুলিশকে। ব্যারিকেড ভাঙা, পুলিশের লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন এক চরম আকার ধারণ করে। তবে সোমবারের এই বিশাল জনসমুদ্র এবং অভাবনীয় সাড়ার পর, সিজেপি বা ককরোচ জনতা পার্টির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই আন্দোলনের মোমেন্টাম বা গতিপ্রকৃতি আগামী দিনেও সফলভাবে ধরে রাখা। ডেকান হেরাল্ডের মতো একটি বস্তুনিষ্ঠ ও সরাসরি সংবাদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্দোলনের পরবর্তী ধাপই নির্ধারণ করবে এই প্রতিবাদের ভবিষ্যৎ।


গত ২৪ দিন ধরে দিল্লির যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছিল সিজেপি। তাদের মূল দাবি, নিট কেলেঙ্কারির সম্পূর্ণ দায় স্বীকার করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে এবং মৃত পড়ুয়াদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সোমবার সেই আন্দোলনই এক বিরাট রূপ নেয়। সিজেপি-র আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্রছাত্রী, নারী ও বয়স্ক মানুষেরা এসে জড়ো হন। তারা যখন সংসদের দিকে এগোতে শুরু করেন, তখন পুলিশের একাধিক ব্যারিকেডের মুখোমুখি হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে। এই ভয়াবহ সংঘর্ষে পুলিশকর্মী এবং আন্দোলনকারী মিলিয়ে অন্তত ১৭০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। প্রশাসন সূত্রে খবর, আহতদের মধ্যে ১০০ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য রয়েছেন। এছাড়া আন্দোলনের জেরে রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটসহ বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের গেট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন (ডিএমআরসি)। বিনা অনুমতিতে ড্রোন উড়িয়ে বিক্ষোভের ফুটেজ নেওয়ার অভিযোগে পুলিশ একটি এফআইআর-ও দায়ের করেছে।


সিজেপি-র এই আন্দোলন শুধু ছাত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ ও সেলিব্রিটিরাও এই আন্দোলনে সোচ্চার হয়েছেন। সোমবারের মিছিলে বর্ষীয়ান অভিনেত্রী শাবানা আজমি, অভিনেতা প্রকাশ রাজ থেকে শুরু করে সমাজবাদী পার্টির নেত্রী ডিম্পল যাদবকেও দেখা যায়। অনুরাগ কাশ্যপ, বীর দাস এবং রীতেশ দেশমুখের মতো বলিউড ব্যক্তিত্বরাও সোশ্যাল মিডিয়ায় পুলিশের ভূমিকার তীব্র নিন্দা করেছেন।
অন্যদিকে, শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক, যিনি এই আন্দোলনের সমর্থনে দীর্ঘ সময় ধরে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন, তিনি বর্তমানে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গেছে এবং শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। তবে হাসপাতাল থেকেই তিনি একটি চিঠিতে জানিয়েছেন, যুবনেতাদের সঙ্গে সরকারের গঠনমূলক আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন।

পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে কেন্দ্র সরকারও তড়িঘড়ি পদক্ষেপ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা সিজেপি-র প্রতিনিধি দলের (সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা) সঙ্গে নিজের বাসভবনে একটি দীর্ঘ বৈঠক করেন। নাড্ডা জানিয়েছেন, অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে এবং আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে একটি লিখিত দাবিপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে। তবে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এক্সে (সাবেক টুইটার) পুলিশি হামলার তীব্র নিন্দা করে নারী বিক্ষোভকারীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের বৃহত্তর লড়াই থামবে না।

সিজেপি-র কাছে এটি এখন এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। একটি সদ্য গড়ে ওঠা সংগঠন হিসেবে তারা যেভাবে গোটা দেশের তরুণ প্রজন্মকে একজোট করে সংসদের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে, তা সাম্প্রতিক ভারতের রাজনীতিতে এক বিরল ঘটনা। কিন্তু সোমবারের এই ব্যাপক জনসমর্থন এবং তীব্র উত্তেজনার পর আন্দোলনকে একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়াই তাদের প্রধান পরীক্ষা। একদিকে সরকারের তরফে আলোচনার প্রস্তাব, অন্যদিকে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের পুলিশি হেনস্থার শিকার হওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে সংগঠনটি কীভাবে তাদের রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তায় আন্দোলন জারি রাখলে সাধারণ পড়ুয়াদের মধ্যে ক্লান্তি বা হতাশা আসতে পারে, আবার সরকারের সঙ্গে চটজলদি আপস করলে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। তাই শুধু রাস্তায় লোক নামানো নয়, বরং এই বিপুল জনরোষকে পুঁজি করে শিক্ষাক্ষেত্রে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব কি না, তা পুরোপুরি সিজেপি-র আগামী দিনের পরিণত রণকৌশলের ওপর নির্ভর করছে।


বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply