নিউ ইয়র্ক, ১৭ জুলাই:কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)-এর জগতে সাম্প্রতিকতম সংযোজন ‘অ্যানথ্রপিক মিথস’ (Anthropic Mythos) মডেলটিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা যখন এই প্রযুক্তির অমিত সম্ভাবনা নিয়ে উচ্ছ্বসিত, ঠিক তখনই এর অন্তর্নিহিত নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করলেন মার্কিন ধনকুবের তথা বিশ্বের বৃহত্তম আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মর্গ্যান চেজ-এর সিইও জেমি ডিমন। সেনেটর ডেভ ম্যাককরমিকের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত ‘পেনসিলভেনিয়া ডিফেন্স অ্যান্ড ইনোভেশন সামিট’-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডিমন অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই প্রযুক্তির লাগামহীন ব্যবহারের বিপদ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, অনভিজ্ঞ কিংবা অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো ব্যক্তির হাতে এই উন্নত এআই মডেল তুলে দেওয়া এবং সাধারণের হাতে ‘ব্যালিস্টিক মিসাইল’ বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তুলে দেওয়া কার্যত একই বিষয়।
প্রযুক্তি সংস্থা ‘অ্যানথ্রপিক’-এর তৈরি করা এই ‘মিথস’ মডেলটি মূলত সাইবার নিরাপত্তার ত্রুটি খোঁজার জন্য অত্যন্ত দক্ষ করে তৈরি করা হয়েছে। জেপি মর্গ্যান ইতিমধ্যেই তাদের নিজস্ব করপোরেট সফটওয়্যার এবং ব্যাংকিং পরিকাঠামোয় এই এআই মডেলের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখেছে। ব্যাংক সূত্রের খবর, পরীক্ষা চলাকালীন এই মডেলটি করপোরেট সফটওয়্যারগুলির মধ্যে এমন হাজার হাজার নিরাপত্তার ফাঁকফোকর ও দুর্বলতা (Vulnerabilities) চিহ্নিত করেছে, যা সাধারণ মানুষের বুদ্ধিমত্তা বা প্রচলিত প্রযুক্তির পক্ষে ধরা অসম্ভব ছিল।
জেমি ডিমন জানান, প্রযুক্তিটি অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও এর অপব্যবহারের আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রশাসন ও ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই এই বিষয়টিকে ‘বাস্তব ও গভীর সংকট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং এর ওপর কড়া নজরদারি শুরু করেছে। ইতিপূর্বে মার্কিন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ অ্যানথ্রপিক-এর এই মডেলের ওপর কিছু কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, যার ফলে বিদেশি নাগরিকদের জন্য এর ব্যবহারে রাশ টানা হয়। পরবর্তীকালে সংস্থাটি অতিরিক্ত সুরক্ষাকবচ বা সেফগার্ড যুক্ত করার পর সেই বিধিনিষেধ আংশিক শিথিল করা হয়।
একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিমন স্পষ্ট করেন যে, এআই মডেল যেমন একদিকে সাইবার পরিকাঠামো মজবুত করতে সাহায্য করতে পারে, ঠিক তেমনি অপরাধীদের হাতে পড়লে এটি এক বিধ্বংসী সাইবার অস্ত্রে পরিণত হতে পারে। জেপি মর্গ্যানের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার (CFO) জেরেমি বারনামও এই সুর মেলালেন। তাঁর বক্তব্য, অপরাধ জগতের কুচক্রীরা এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো বড় ব্যাংক, বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা সংবেদনশীল ডেটা সার্ভারের নিরাপত্তা ভেঙে ফেলতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার মূলধনের এই ব্যাংকের প্রধান মনে করেন, শুধু ব্যাংকিং ক্ষেত্র নয়, বিশ্বজুড়ে সমস্ত এক্সচেঞ্জ, ডেটা শেয়ারিং নেটওয়ার্ক এবং ক্লাউড স্টোরেজ যেভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত, তাতে একটি জায়গার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার চেইন রিঅ্যাকশন বা পারস্পরিক প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক।
এই অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত জটিলতার মুখে দাঁড়িয়েও জেমি ডিমন সনাতনী বা বুনিয়াদি সাইবার নিরাপত্তার অভ্যাসের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, এআই যতই উন্নত হোক না কেন, ডেটা সুরক্ষার প্রাথমিক নিয়মাবলি যেমন- নিয়মিত পাসকোড পরিবর্তন, রাউটার ও হার্ডওয়্যারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সঠিক ডেটা হাইজিন মেনে চললে সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে মিথস-এর মতো মডেলে সাধারণের প্রবেশাধিকার যে কোনোভাবেই অবাধ রাখা উচিত নয়, সে বিষয়ে মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
