প্রধানমন্ত্রী মোদীর ভিডিও ডিলিট বিতর্ক ও ডিপফেক ইস্যুতে ক্ষমা প্রার্থনা মেটা সিইও মার্ক জুকারবার্গের

প্রধানমন্ত্রী মোদীর ভিডিও ডিলিট বিতর্ক ও ডিপফেক ইস্যুতে ক্ষমা প্রার্থনা মেটা সিইও মার্ক জুকারবার্গের

নয়াদিল্লি, ৬ আগস্ট:শিশু যৌন নির্যাতনমূলক সামগ্রী বা সিএসএএম সম্বলিত বিজ্ঞাপন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি ডিপফেক কনটেন্ট এবং সাম্প্রতিক সময়ে প্ল্যাটফর্ম পরিচালনায় মারাত্মক ত্রুটির ঘটনায় ভারত সরকারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন মেটা সিইও মার্ক জুকারবার্গ। সরকারি সূত্রের বরাতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মেটার আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সভাপতি জোয়েল কাপলান গত ৫ আগস্ট ভারতের কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এবং ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের সচিব এস কৃষ্ণনের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন। উক্ত বৈঠকেই জুকারবার্গের এই বার্তা ও দুঃখপ্রকাশের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পরীক্ষা সংক্রান্ত সংস্কারমূলক বক্তব্যের একটি ভিডিও মেটা প্ল্যাটফর্ম থেকে ভুলবশত মুছে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা ও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এই শীর্ষস্তরের বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক ও প্রযুক্তি মহল।

প্রধানমন্ত্রীর ভিডিওটি ফেসবুক থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য সরিয়ে নেওয়ার ঘটনার পর ভারতীয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছিল। বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবের নেতৃত্বাধীন সেই প্যানেল থেকে মেটা প্রধান মার্ক জুকারবার্গকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাওয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি সময়মতো সন্তোষজনক পদক্ষেপ না নিলে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৭৯ নম্বর ধারার অধীনে মেটাকে দেওয়া ‘সেফ হারবার’ বা আইনি সুরক্ষার অধিকার বাতিল করার কড়া হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল। আইনি সুরক্ষা তুলে নেওয়া হলে ভারতে সাধারণ প্রকাশকদের মতো মেটার বিরুদ্ধেও যে কোনো আপত্তিকর কনটেন্টের জন্য সরাসরি ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুযোগ তৈরি হতো। এই অভূতপূর্ব আইনি চাপ ও সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়ের পরই মেটার আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দল দ্রুত নয়াদিল্লিতে উপস্থিত হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রক ও প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।

সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে আয়োজিত এই বৈঠকে মেটার পক্ষ থেকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে অ্যালগরিদম ও প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু গুরুতর কারিগরি ও পরিচালনগত ত্রুটি ঘটেছে। একই সঙ্গে টাকার বিনিময়ে বা পেইড বুস্টিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষতিকারক ও বিতর্কিত কনটেন্টকে প্ল্যাটফর্মে বাড়তি প্রচার পাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। আন্তর্জাতিক এই সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট জানিয়েছে যে প্ল্যাটফর্মে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার বন্ধ করতে এবং শিশুদের সুরক্ষা বজায় রাখতে তারা তাদের কনটেন্ট মডারেশন বা তথ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করবে। তবে ভারতীয় ভূখণ্ডে কাজ করতে গিয়ে যে ভুলত্রুটি হয়েছে, সে বিষয়ে প্রযুক্তি সংস্থার শীর্ষ পর্যায় থেকে এই ধরনের দুঃখপ্রকাশকে কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর অবস্থানের এক বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলির ওপর অ্যালগরিদমিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার যে দাবি উঠছে, ভারত সরকারের এই পদক্ষেপ তাকে একটি নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিল। বিশেষ করে শিশু সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা, ডিপফেক ভিডিও শনাক্ত ও অপসারণ করা এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সামাজিক মাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ বজায় রাখার বিষয়ে ভারতীয় তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রক স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কোনো সংস্থাই দেশের আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলিকে ভারতে তাদের পরিষেবা চালু রাখতে হলে অবশ্যই দেশীয় আইনকানুন ও অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা বজায় রেখে কাজ করতে হবে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের এই অনমনীয় ও কঠোর নীতির ফলে আগামী দিনে মেটা সহ অন্যান্য সমস্ত প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলিকে ভারতে কাজ করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্ক ও দায়বদ্ধ থাকতে হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply