নেপালে পরপর দু’দিনে জীবিত উদ্ধার ৪, নতুন আশার আলো সুড়ঙ্গে

নেপালে পরপর দু’দিনে জীবিত উদ্ধার ৪, নতুন আশার আলো সুড়ঙ্গে

নেপাল, ৫ সেপ্টেম্বর:

হিমালয়ের কোলে প্রলয়ঙ্কর বিপর্যয়ের পর যখন স্বজন হারানোর হাহাকার আর ধ্বংসের নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছিল চারপাশকে, ঠিক তখনই মৃত্যুকে জয় করে ফিরে এলেন চার জন। গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধসের জেরে নেমে আসা আকস্মিক হড়পা বানে কার্যত তছনছ হয়ে গিয়েছিল নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। কাদা, পাথর আর জমাট বাঁধা পলিমাটির তলায় চাপা পড়ে থাকা হাজার হাজার প্রাণের আশা যখন ক্ষীণ হয়ে আসছিল, তখনই পরপর দু’দিনে মাটির গভীরে তৈরি হওয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে চার জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এই অভাবনীয় ঘটনার পর নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন নিখোঁজদের পরিজনেরা এবং উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা।

নেপাল সেনা সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ২২৫ মিটার দীর্ঘ একটি জলমগ্ন ও কাদাভর্তি সুড়ঙ্গ থেকে দীর্ঘ ১০ দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয় এক চিনা নাগরিককে। লুহাইতাও নামের ওই চিনা ইঞ্জিনিয়ারকে উদ্ধার করতে নেপালি সেনার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয় দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আসা বিপর্যয় মোকাবিলা বিশেষজ্ঞ দল। উদ্ধারের পর দৃশ্যতই শারীরিক দিক থেকে ক্লান্ত ও অবসন্ন হলেও তিনি সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তাঁর শরীরে ও দুই হাতে তখনও পুরু কাদার আস্তরণ লেগে ছিল। সেনা জওয়ানদের কাঁধে ভর দিয়ে তিনি নিরাপদে বাইরে আসেন। সেখান থেকে দ্রুত হেলিকপ্টারে চাপিয়ে তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আকাশপথেই তাঁর প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা করেন সেনার চিকিৎসকরা।

এর ঠিক আগের দিন, শুক্রবার সকালে একই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ত্রিশূলী থ্রি-এ-এর সুড়ঙ্গ থেকে অবিশ্বাস্যভাবে জীবিত বের করে আনা হয়েছিল দুই নেপালি শ্রমিককে। উদ্ধার হওয়া সেই দুই ব্যক্তি হলেন প্রকল্পের মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় শাহ এবং সুপারভাইজার কবীর মহাজন। সহকর্মীদের বাঁচাতে গিয়েই তাঁরা মূলত সুড়ঙ্গের মধ্যে আটকা পড়ে গিয়েছিলেন বলে জানা যায়। নয় দিন ধরে আলোর মুখ না দেখা এই দুই কর্মী উদ্ধারের পর জানিয়েছিলেন, সুড়ঙ্গের অভ্যন্তরে তখনও আরও কয়েক জনের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই জোরদার করা হয়েছিল অভিযান। অন্যদিকে নুয়াকোট শহরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি থেকে ৬৪ বছর বয়সি বৃদ্ধা চণ্ডিকা শ্রেষ্ঠাকেও অক্ষত অবস্থায় জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা।

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত এই ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ১,৩০০ মানুষের মৃত্যুর খবর মিলেছে এবং নিখোঁজের সংখ্যা ছাড়িয়ে গিয়েছে ৫ হাজারেরও বেশি। কেবল ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকেই প্রায় ৯০০ জন কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে আনুমানিক ৫০০ জন বিভিন্ন সুড়ঙ্গের গভীরে আটকে পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নেপাল সেনার সঙ্গে যৌথভাবে উদ্ধারকাজে হাত লাগিয়েছে ভারত, চিন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপর্যয় মোকাবিলা দলগুলি। কাদা ও পাথরে বন্ধ হয়ে যাওয়া সুড়ঙ্গগুলির নকশা ও সঠিক অবস্থান উদ্ধারকারী দলের হাতে তুলে দিতে প্রায় ৫০০ জন ইঞ্জিনিয়ারের একটি দল প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে চলেছে।

দ্রুত মৃতদেহে পচন ধরতে শুরু করায় পরিচয় নিশ্চিত করার স্বার্থে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ইতিমধ্যেই এক হাজারেরও বেশি মরদেহ গণকবরে সৎকার করা হয়েছে। তবে প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থান ও জমাট বাঁধা কাদার মধ্যেও যেভাবে একের পর এক প্রাণ ফিরে আসছে, তাতে উদ্ধারকাজ আরও দ্রুত ও জোরকদমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তা মিলেছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply