দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির আন্দোলনের ঝড়, কিন্তু মুসলিম তরুণদের মনে কেন এক অদৃশ্য ভয়?

দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির আন্দোলনের ঝড়, কিন্তু মুসলিম তরুণদের মনে কেন এক অদৃশ্য ভয়?

বিশেষ সংবাদদাতা, নতুন দিল্লি: দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কঙ্কালটা যখন নিট (NEET) বা প্রশ্নফাঁসের কেলেঙ্কারিতে হাটে হাঁড়ি ভেঙে মাঝরাস্তায় এসে দাঁড়াল, তখন রাজধানীর রাজপথ আরও একবার গর্জে উঠেছিল যুব সমাজের ক্ষোভে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ তথা ‘সিজেপি’-এর ব্যানারে যন্তর মন্তরে আয়োজিত সেই বিক্ষোভ যেন ছিল এক নতুন প্রজন্মের অস্তিত্বের লড়াই। কিন্তু সেই চেনা স্লোগান, প্ল্যাকার্ড আর স্বতঃস্ফূর্ততার আড়ালেই দিল্লির বাতাসে ভাসছিল এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন। ভারতের বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যুবকেরা এই আন্দোলনে ঠিক কোন ভূমিকায়? দেশের এক বৃহত্তর নাগরিক সংকটে শামিল হতে গিয়েও কেন এক অদৃশ্য আশঙ্কার দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে মুসলিম তরুণদের একাংশ?

আন্দোলনের কোলাহলের সমান্তরালে এই প্রশ্নটিই এখন জাতীয় রাজনীতির অলিন্দে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।

ইতিহাসের শিক্ষা বড় নিষ্ঠুর। আর সেই নিষ্ঠুর পাঠ থেকেই তৈরি হয়েছিল এক অলিখিত সাবধানবাণী। যন্তর মন্তরের আন্দোলনের দিনকয়েক আগে থেকেই দিল্লির মুসলিম প্রধান এলাকাগুলির অন্দরে, সোশাল মিডিয়ার দেওয়ালে কিংবা মসজিদের ইমামদের বয়ানে একটি সতর্কবার্তা নিঃশব্দে ঘুরছিল— “যন্তর মন্তরের ধারকাছ দিয়েও যাবেন না।”

এই সাবধানতার শিকড় লুকিয়ে রয়েছে বিগত কয়েক বছরের দগদগে স্মৃতিতে। সিএএ-বিরোধী আন্দোলন থেকে উত্তর-পূর্ব দিল্লির দাঙ্গা— বারবার দেখা গিয়েছে, রাজপথের ক্ষণিকের আবেগের মাশুল সবচেয়ে বেশি গুনতে হয়েছে সংখ্যালঘু তরুণদেরই। তকমা লেগেছে ‘দেশবিরোধী’র, জুটেছে দীর্ঘ আইনি হেনস্থা আর কারাবাস। অভিভাবক ও সমাজনেতাদের আশঙ্কা, আন্দোলনের উদ্দেশ্য যতই সৎ হোক না কেন, কোনোভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে রাষ্ট্রীয় রোষের প্রথম শিকার হতে হবে তাঁদের সন্তানদেরই। ফলে, অধিকারের চেয়েও আজ অস্তিত্ব ও আত্মরক্ষা বড় হয়ে উঠেছে এক বিরাট অংশের কাছে।

এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই মুসলিম সমাজকে এক গভীর দ্বন্দ্বে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বুদ্ধিজীবী ও ধর্মীয় নেতৃত্বের একাংশের মত, বর্তমান রাজনৈতিক আবহে আবেগতাড়িত হয়ে রাজপথে নামার চেয়ে শিক্ষার আলোয় নিজেদের প্রতিস্থাপন করা অনেক বেশি জরুরি। রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে ক্যারিয়ার গড়া এবং আইনি জটিলতা এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

অথচ, অন্য একটি অংশ মনে করছে এই নীরবতা আত্মঘাতী। প্রশ্নফাঁস বা শিক্ষা ব্যবস্থার বিপর্যয় কোনো ধর্মীয় সংকট নয়, এটি জাতীয় বিপর্যয়। ভারতের একজন সমানাধিকারী নাগরিক হিসেবে এই লড়াইয়ে যদি মুসলিম যুবকেরা নিজেদের গুটিয়ে রাখেন, তবে মূল স্রোত থেকে তাঁদের বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়বে। অধিকার হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে যদি প্রতিবাদের ভাষাটাই হারিয়ে যায়, তবে তা গণতন্ত্রের পক্ষেই এক অশনি সংকেত।

ভয় আর আশঙ্কার সেই অদৃশ্য দেওয়াল ভেঙেও অবশ্য অনেক মুসলিম তরুণ হাজির হয়েছিলেন যন্তর মন্তরের চত্বরে। জেন-জি (Gen Z) প্রজন্মের এই প্রতিনিধিরা স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই লড়াই কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর লড়াই।

যদিও বিক্ষোভের মাঝেই কিছু চেনা স্বার্থান্বেষী মহল চক্রান্তের জাল বিছিয়েছিল। হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের সস্তা রাজনীতি দিয়ে আন্দোলনের মূল সুরটিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের ছাত্ররা সেই ফাঁদে পা দেননি। সিজেপি-এর মঞ্চ ও সাধারণ পড়ুয়ারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সেই সাম্প্রদায়িক উসকানি রুখে দেন। বুঝিয়ে দেন, ক্ষোভের রঙ এখানে শুধুই প্রতিবাদের, অন্য কোনো রাজনীতির নয়।

যন্তর মন্তরের এই সমাবেশ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতগুলোকে যেমন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, তেমনই উন্মোচিত করল এক গভীর সামাজিক ক্ষতকেও। দেশের একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দিতে যাওয়ার আগে দেশেরই এক বিরাট অংশের নাগরিককে যখন একশো বার নিজের নিরাপত্তা আর আইনি ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হয়, তখন তা কোনো সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ হতে পারে না। সিজেপি-এর মঞ্চ আজ শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষানীতিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়নি, বরং ভারতীয় মহাজাতির অন্দরে তৈরি হওয়া এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতাকেও এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দিয়ে গেল।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply