“হৃদস্পন্দন যেন থমকে গিয়েছিল!” দিল্লির বিক্ষোভে পেলেট বন্দুকের শিকার পঞ্চম প্রতিবাদী, পুলিশের দাবির মুখে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

“হৃদস্পন্দন যেন থমকে গিয়েছিল!” দিল্লির বিক্ষোভে পেলেট বন্দুকের শিকার পঞ্চম প্রতিবাদী, পুলিশের দাবির মুখে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

নতুন দিল্লি, ২৭ জুলাই: দেশের রাজধানী দিল্লিতে সাম্প্রতিক ছাত্র ও যুব আন্দোলনের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমনপীড়নের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। গত ২০ জুলাই জন্তর মন্তর ও সংসদ ভবন অভিযানের সময় নিরাপত্তাকর্মীদের ছোঁড়া পেলেট বন্দুকের (ছররা গুলি) আঘাতে অন্তত পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্র ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে পঞ্চম পেলেট ভিকটিমের চাঞ্চল্যকর অভিজ্ঞতা আলোড়ন তৈরি করেছে। “মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল আমার হৃদস্পন্দন যেন থমকে যাবে,” হাসপাতালে শুয়ে সেই অভিজ্ঞতার বিবরণ দিতে গিয়ে শিউরে উঠেছেন ছররা গুলিতে আহত এক প্রতিবাদী।

দিল্লির সফদারজং হাসপাতাল, লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিকেল কলেজ এবং এইমস (AIIMS) ট্রমা সেন্টারের মেডিকেল রিপোর্টে স্পষ্ট ধরা পড়েছে যে, আহতদের শরীরে ধাতব পেলেট বা ছররা গুলির উপস্থিতি রয়েছে। ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সাহিল লোচাব এবং ২৫ বছর বয়সী আইটি কর্মী শেখ এরশাদ মনসুরীর পর আরও একাধিক প্রতিবাদী মুখ, ঘাড়, বুক ও পিঠে মারাত্মক আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।

চিকিৎসকদের মতে, ছররা গুলিগুলির আঘাত অত্যন্ত গভীর। সাহিল লোচাবের ডান চোখের কর্নিয়া ছিদ্র হয়ে ভেতরে ধাতব পেলেট আটকে থাকায় তাঁর দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারানোর চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, অন্য এক ভিকটিমের ফুসফুস ও হৃদপিণ্ডের পেপারিওকার্ডিয়াল ফ্যাটের কাছে পেলেট আটকে থাকার খবর মিলেছে। অন্যদিকে লেডি হার্ডিঞ্জে চিকিৎসাধীন এরশাদ মনসুরীর মুখ ও ঘাড় থেকে অস্ত্রোপচার করে একাধিক ছররা গুলি বের করা হলেও, একটি পেলেট রক্তনালীর খুব কাছে থাকায় তা এখনো বের করা সম্ভব হয়নি।

আহতদের বিবরণ অনুযায়ী, সংসদ অভিযানের সময় পরিস্থিতি হঠাৎই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে প্রথমে টিয়ার গ্যাস ছোঁড়া হয় এবং পরবর্তীতে অত্যন্ত কাছ থেকে পেলেট গান ব্যবহার করা হয়। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এক আহত প্রতিবাদী জানান, “প্রথমে মুখ ও গায়ে তীব্র জ্বালা অনুভব করি। তারপর হাত দিয়ে দেখি চারিদিকে শুধু রক্ত। আমরা তো কোনো অপরাধী বা সন্ত্রাসী নই, দেশের নাগরিক হিসেবে শুধু নিজেদের অধিকার ও শিক্ষা ব্যবস্থার দাবির কথা জানাচ্ছিলাম। পুলিশকে অনুরোধ করা সত্ত্বেও রেহাই মেলেনি।”

অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, দ্রুত এলাকা খালি করতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF)-এর কর্মীরা সাধারণ আন্দোলনকারীদের ওপর মারাত্মক বলপ্রয়োগ করে। পেলেট বন্দুকের পাশাপাশি বিদ্যুৎ তরঙ্গের ‘শক ব্যাটন’ ব্যবহারেরও অভূতপূর্ব অভিযোগ উঠেছে।

বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ার পর দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তাদের কোনো দল পেলেট গান ব্যবহার করেনি এবং এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন সম্পূর্ণ “ভুল ও বিভ্রান্তিকর”। তবে সরকারি হাসপাতালের লিখিত ডিসচার্জ সামারি, চিকিৎসা নথি, সিটি স্ক্যান রিপোর্ট এবং খোদ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার হাসপাতালে গিয়ে আহত ভিকটিমদের দেখার তথ্য পুলিশের এই দাবিকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সিআরপিএফ-এর অধীনস্থ র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের দাঙ্গা দমন উপকরণের তালিকায় পেলেট গান ও ইলেকট্রিক শক ব্যাটন থাকলেও, বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কাশ্মীর বা সীমান্ত এলাকার বাইরে খোদ জাতীয় রাজধানীতে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এভাবে বিপজ্জনক পেলেট বন্দুকের ব্যবহার নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষা নিয়ে সারা দেশে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply