“গঙ্গায় বিরিয়ানি খাওয়াও অপরাধ? আইনি ব্যবস্থা নয়, সাধারণ জীবনযাপনকে অপরাধ বানানোর প্রবণতা বিপজ্জনক”: বারাণসীর ইফতার বিতর্ক নিয়ে কড়া মন্তব্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির

“গঙ্গায় বিরিয়ানি খাওয়াও অপরাধ? আইনি ব্যবস্থা নয়, সাধারণ জীবনযাপনকে অপরাধ বানানোর প্রবণতা বিপজ্জনক”: বারাণসীর ইফতার বিতর্ক নিয়ে কড়া মন্তব্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির

নতুন দিল্লি, ২৭ জুলাই: বারাণসীতে গঙ্গা নদীর বুকে নৌকায় বসে ইফতার পার্টিতে চিকেন বিরিয়ানি খাওয়ার অপরাধে ১৪ জন মুসলিম যুবককে গ্রেফতার ও টানা ৩ মাস জেলে আটকে রাখার ঘটনা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুইয়াঁ। দেশের সংবিধানে কোথাও এমন কোনও আইন নেই যা কোনও নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট খাবার গ্রহণকে অপরাধ বলে গণ্য করে। সাধারণ সামাজিক ও স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বলপূর্বক আইনি অপরাধের তকমা দেওয়ার এই প্রবণতাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৬ সালের মার্চ মাসে। পবিত্র রমজান মাসে বারাণসী সংলগ্ন গঙ্গা নদীতে একটি নৌকায় ইফতারের আয়োজন করেছিলেন ১৪ জন মুসলিম যুবক। অভিযোগ ওঠে, সেই ইফতার পার্টিতে আমিষ খাবার অর্থাৎ চিকেন বিরিয়ানি পরিবেশন করা হয়েছিল। এই খবর জানাজানি হতেই কিছু স্থানীয় সংগঠন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ তোলে এবং পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।

অভিযোগের ভিত্তিতে বারাণসী পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) একাধিক কড়া ধারায় মামলা রুজু করে ওই যুবকদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা এবং দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা ও ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল।

গ্রেফতারির পর বারাণসীর স্থানীয় নিম্ন আদালতে আসামিদের পক্ষ থেকে জামিনের আবেদন করা হলেও আদালত তা সোজাসুজি নাকচ করে দেয়। পুলিশি হেফাজত ও পরবর্তী বিচারবিভাগীয় হেফাজতে ওই যুবকদের টানা প্রায় তিন মাস কারাগারের অন্ধ কুঠুরিতে দিন কাটাতে হয়। পরবর্তীতে মে মাসে মামলাটি এলাহাবাদ হাইকোর্টে উঠলে বিচারপতিদের বেঞ্চ যুবকদের জামিন মঞ্জুর করে এবং তাঁদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে এই তিন মাসের দীর্ঘ বন্দিদশা ও আইনি জটিলতা তাঁদের জীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের ভোপালে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের আইনি বক্তৃতা ও আলোচনায় অংশ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুইয়াঁ এই ঘটনাটির কথা সবিস্তারে তুলে ধরেন। বিচার ব্যবস্থা ও মৌলিক অধিকারের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে তিনি বলেন, “নৌকায় উঠে চিকেন বিরিয়ানি খাওয়ার মধ্যে এমন কী অপরাধ রয়েছে যা কাউকে তিন মাস জেলে আটকে রাখার পক্ষে যথেষ্ট হতে পারে? ভারতের কোনও আইনে গঙ্গার ওপর বিরিয়ানি খাওয়া নিষিদ্ধ নয়।”

বিচারপতি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ইদানীংকালে সাধারণ ও নৈমিত্তিক জীবনের নানা ঘটনাকে অতিরিক্ত অপরাধীকরণ (over-criminalization) করার এক মারাত্মক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কোনো ঘটনায় যদি সামান্যতম ভিন্নমত বা তথাকথিত উস্কানির ছায়া দেখা যায়, তবে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কড়া আইনি ধারা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর থেকেও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরণের মামলাগুলিতে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই জামিন আটকে রেখে নাগরিকদের বছরের পর বছর বা মাসের পর মাস জেলে বন্দি করে রাখার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির এই বক্তব্যে দেশের বিচার বিভাগীয় ও নাগরিক অধিকার রক্ষা মহলে বড়সড় আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নাগরিকের খাওয়ার স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় আচরণের সীমানা নির্ধারণের নামে যেভাবে কড়া আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা সংবিধান প্রদত্ত ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী বলেই মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। বিচারপতির এই স্পষ্ট বার্তা প্রশাসনের অতি-সক্রিয়তা ও নিম্ন আদালতের ঢিলেঢালা জামিন ব্যবস্থার ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিল।

Keywords:

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Headline Translation:

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply