স্কুলে কোনোদিন পা রাখেননি ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী! কীভাবে গড়ে তুললেন আইআইটি থেকে ইউজিসি?

স্কুলে কোনোদিন পা রাখেননি ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী! কীভাবে গড়ে তুললেন আইআইটি থেকে ইউজিসি?

নয়াদিল্লি, ৩১ জুলাই: স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার রূপকার এবং প্রখ্যাত সমাজসংস্কারক মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে নিয়ে একটি বিস্ময়কর তথ্য আজও অনেককে অবাক করে। ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার শক্ত ভিত যিনি তৈরি করেছিলেন, দেশ জুড়ে স্থাপন করেছিলেন একের পর এক প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সেই মৌলানা আজাদ জীবনে কখনো কোনো প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে (School) পড়তে যাননি। কোনো স্কুলের শ্রেণিকক্ষে না বসেও কীভাবে একজন মানুষ একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিশারী হয়ে উঠলেন এবং আইআইটি (IIT) ও ইউজিসি (UGC)-র মতো প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিলেন— তা ভারতের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

১৮৮৮ সালের ১১ নভেম্বর মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। তাঁর পরিবার ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল ও পণ্ডিতদের পরিবার। বালক বয়সে তাঁকে কোনো প্রথাগত স্কুলে পাঠানো হয়নি। বরং নিজ গৃহেই চলত তাঁর শিক্ষার মূল পাঠ। বাবা মাওলানা খায়রুদ্দিন এবং পরিবারের অন্যান্য গৃহশিক্ষকদের কাছ থেকে তিনি আরবি, ফারসি, উর্দু, দর্শন, জ্যামিতি, গণিত ও বীজগণিতের শিক্ষা নেন।

স্কুলে না গেলেও আজাদের জানার পরিধি এবং শেখার প্রতি আগ্রহ ছিল অসীম। নিজ চেষ্টাতেই তিনি ইংরেজি ভাষা শেখেন এবং বিশ্ব সাহিত্য, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করান। নিজের মেধা ও নিষ্ঠার জোরে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তিনি আরবি ও পার্সিয়ান ভাষার পণ্ডিত হিসেবে পরিগণিত হন এবং অন্য শিক্ষার্থীদের পড়াতে শুরু করেন। প্রথাগত ডিগ্রির তোয়াক্কা না করে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত এই ব্যক্তিত্ব পরবর্তীকালে ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অন্যতম কাণ্ডারী হয়ে ওঠেন।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু স্বাধীন ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব তুলে দেন মৌলানা আজাদের হাতে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৮ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই পদে আসীন ছিলেন। স্বাধীনতার পর একটি দরিদ্র ও অশিক্ষায় আচ্ছন্ন দেশকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু আজাদ বিশ্বাস করতেন, প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা— সর্বস্তরে উন্নতি না হলে একটি স্বাধীন দেশ স্বাবলম্বী হতে পারে না।

তাঁকে যখন প্রথম শিক্ষামন্ত্রী করা হয়, তখন দেশে স্বাক্ষরতার হার ছিল অত্যন্ত কম। এই পরিস্থিতিতে তিনি জোর দেন বিনামূল্যে এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার ওপর। পাশাপাশি ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার ঐতিহাসিক প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে ভারতের সংবিধানে মূল নীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

মৌলানা আজাদের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক অবদান হলো ভারতের কারিগরি ও উচ্চশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করা। একটি সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য বিশ্বমানের ইঞ্জিনিয়ার এবং বিজ্ঞানী তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

আইআইটি (IIT) স্থাপন: ১৯৫১ সালে খড়গপুরে ভারতের প্রথম ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ (IIT Kharagpur)-র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় মৌলানা আজাদের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে ও পরিকল্পনায়। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, ভারতের তরুণদের আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিগত শিক্ষা দেওয়া না গেলে দেশ শিল্পায়নে পিছিয়ে পড়বে। পরবর্তীকালে তাঁর এই দূরদর্শী ভাবনাই দেশকে আইআইটির মতো বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উপহার দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC): উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৫৩ সালে তিনি ‘ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন’ বা ইউজিসি-র সূচনা করেন। ১৯৫৬ সালে এটি সংসদের আইনের মাধ্যমে সংবিধিবদ্ধ সংস্থার রূপ পায়।

সংস্কৃতি ও গবেষণার প্রসার: কেবল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নয়, ভারতের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশেও তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। তাঁর মেয়াদকালেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সঙ্গীত নাটক আকাদেমি’ (১৯৫৩), ‘সাহিত্য আকাদেমি’ (১৯৫৪) এবং ‘ললিত কলা আকাদেমি’ (১৯৫৪)। এ ছাড়া এশীয় ভাষা ও সংস্কৃতি গবেষণার জন্য ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস’ (ICCR)-ও তৈরি করেছিলেন তিনি।

উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি দেশ জুড়ে প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষা এবং নারী শিক্ষার ওপর তিনি সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে নারীদের শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। তাই তিনি নারী শিক্ষার জন্য বিশেষ প্রকল্প চালু করেন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলার ওপর জোর দেন। তিনি বলতেন, “যে দেশ তার নারীসমাজকে অশিক্ষিত রাখে, সে দেশ কখনো উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না।”

স্কুলের প্রথাগত চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ না থেকেও একজন মানুষ যে কেবল নিজের চেষ্টায় জ্ঞানার্জন করতে পারেন তা-ই নয়, বরং একটি পুরো জাতির শিক্ষার ভবishyৎ বদলে দিতে পারেন— মৌলানা আবুল কালাম আজাদ তার উজ্জ্বল প্রমাণ। ১৯৯২ সালে তাঁকে মরণোত্তর দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘ভারত রত্ন’-এ ভূষিত করা হয়। তাঁর জন্মবার্ষিকী ১১ নভেম্বর প্রতি বছর সমগ্র ভারতে ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’ (National Education Education Day) হিসেবে সাড়ম্বরে পালিত হয়।

আইআইটি, ইউজিসি এবং কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির দিকে তাকালে আজ বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কোনো প্রথাগত ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও এই দূরদর্শী মানুষটি ভারতের জন্য যা করে গিয়েছেন, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেশগঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply