নয়াদিল্লি, ৩১ জুলাই: ২০২০ সালের উত্তর-পূর্ব দিল্লির ভয়াবহ দাঙ্গার নেপথ্যে থাকা তথাকথিত ‘বৃহত্তর চক্রান্ত’ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া প্রাক্তন ছাত্রনেতা উমর খালিদের জামিনের আবেদনের শুনানি আজ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে দিল্লি হাইকোর্টে। আইনি সংবাদ বিষয়ক পোর্টাল ‘বার অ্যান্ড বেঞ্চ’ (Bar and Bench)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচারপতি প্রতিভা এম সিং এবং বিচারপতি বিকাশ মহাজনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে আজ এই আবেদনের আর্জি পেশ করা হবে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বিচারাধীন বন্দি হিসেবে জেলে থাকা উমর খালিদের এই জামিনের আর্জি ঘিরে দেশের আইনি ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (JNU) প্রাক্তন ছাত্রনেতা উমর খালিদকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লি পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা ‘ইউএপিএ’ (UAPA)-র একাধিক কঠোর ধারা এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির নানা অপরাধমূলক ধারায় মামলা রুজু করা হয়।
তদন্তকারী সংস্থাগুলির দাবি, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল, তার পেছনে একটি বড় ধরনের পূর্বপরিকল্পিত চক্রান্ত বা ‘লার্জার কনস্পিরেসি’ ছিল। সেই নাশকতামূলক পরিকল্পনার অন্যতম মূল রূপকার ছিলেন উমর খালিদ। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC)-র বিরুদ্ধে চলা আন্দোলনের সময় তিনি উসকানিমূলক ভাষণ দিয়ে হিংসা ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়। উল্লেখ্য, ২০২০ সালের সেই মর্মান্তিক দাঙ্গায় অন্তত ৫৩ জন সাধারণ মানুষের প্রাণ গিয়েছিল এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছিলেন। বিপুল পরিমাণ সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি বিনষ্ট হয়েছিল।
এর আগে ট্রায়াল কোর্ট বা নিম্ন আদালতে উমর খালিদের জামিনের আবেদন বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। নিম্ন আদালতের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টও তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়।
সর্বোচ্চ আদালতে জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পর, নিম্ন আদালতের সেই পুরোনো খারিজের সিদ্ধান্তকে পুনরায় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতাকে হাতিয়ার করে এবার দিল্লি হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছেন উমর খালিদ। তাঁর আইনজীবীদের মূল বক্তব্য, দীর্ঘ সময় ধরে ট্রায়াল বা বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়া সত্ত্বেও একজন ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন এভাবে জেলে আটকে রাখা তাঁর মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
আদালতে উমর খালিদের সওয়ালের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো তাঁর দীর্ঘ কারাবাস এবং মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তিনি বিগত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলবন্দি রয়েছেন। উমর খালিদের আইনি দলের তরফে বারংবার যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, ইউএপিএ-র মতো কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক প্রাপ্য।
মামলায় হাজার হাজার পৃষ্ঠার চার্জশিট, শতাধিক সাক্ষী এবং দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ার কারণে দাঙ্গা মামলার মূল শুনানি কবে শেষ হবে বা বিচার প্রক্রিয়া কবে নাগাদ সম্পন্ন হবে, তা অত্যন্ত অনিশ্চিত। এই দীর্ঘায়িত বিচার প্রক্রিয়ার দরুন একজন অভিযুক্তকে সীমাহীন সময়ের জন্য হেফাজতে রাখার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ থাকতে পারে না বলে সওয়ালে উল্লেখ করা হয়েছে।
আজ বিচারপতি প্রতিভা এম সিং এবং বিচারপতি বিকাশ মহাজনের বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য নথিভুক্ত হওয়ায় আইনি বিশেষজ্ঞদের নজর থাকবে হাইকোর্টের দৃষ্টিভঙ্গির দিকে। একদিকে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি জাতীয় নিরাপত্তা ও দাঙ্গার ভয়াবহতার দোহাই দিয়ে জামিনের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে, অন্যদিকে আবেদনকারী পক্ষ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচারে বিলম্বের যুক্তি সামনে রাখছেন।
সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং দ্রুত বিচারের অধিকারের সঙ্গে জাতীয় সুরক্ষার আইনি বিধিনিষেধের সংঘাতের ক্ষেত্রে দিল্লি হাইকোর্ট আজ কী অবস্থান গ্রহণ করে, তা উমর খালিদের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত নির্ণায়ক হতে চলেছে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
