লখনউ, ১৯ জুলাই: দেশে ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িকতা এবং পারস্পরিক বিদ্বেষের আবহে সম্প্রীতির এক জোরালো বার্তা দিলেন জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দের সভাপতি মৌলানা আরশাদ মদানি। উত্তরপ্রদেশের লখনউতে জমিয়ত উলামা উত্তরপ্রদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ‘হিন্দু-মুসলিম ইত্তেহাদ কনফারেন্স’ বা সম্প্রীতি সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন অন্যান্য ধর্মের মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং ইসলামের প্রকৃত মর্মার্থ— ভালোবাসা ও সহনশীলতার বার্তা সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “ঘৃণার আগুন কখনও ঘৃণা দিয়ে নেভানো যায় না, তা কেবল ভালোবাসা, স্নেহ এবং ভ্রাতৃত্বের জল দিয়েই নেভানো সম্ভব”।
সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় মৌলানা মদানি মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি একটি বিশেষ আবেদন জানান। তিনি বলেন, মুসলিমদের নিয়ে সমাজে যে ধরনের নেতিবাচক অপপ্রচার বা ভুল ধারণা ছড়ানো হচ্ছে, তা দূর করার দায়িত্ব সম্প্রদায়ের নিজেদেরই নিতে হবে। এই লক্ষ্যে তিনি পরামর্শ দেন, প্রতি বছর অন্তত একবার স্থানীয় মাদ্রাসাগুলিতে অমুসলিম প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণ জানানো উচিত। মাদ্রাসায় আসলে কী শেখানো হয়, মুসলিমদের জীবনধারা, নীতি ও বিশ্বাস কেমন— তা যদি অমুসলিম ভাইদের সামনে খোলামেলাভাবে তুলে ধরা যায়, তবে বহুলাংশে ভুল বোঝাবুঝি ও দূরত্বের অবসান ঘটবে।
দেশে বর্তমান সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জমিয়ত প্রধান। অতীতে কংগ্রেস বা অন্যান্য দলের সরকারের আমলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, সেই সময়েও মুসলিমরা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, কিন্তু কখনও সরাসরি ইসলাম ধর্ম বা ধর্মীয় নীতিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। কিন্তু বর্তমান সময়ে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন কেবল মুসলিম সমাজকেই নিশানা করা হচ্ছে না, বরং তাদের ধর্ম, বিশ্বাস এবং মৌলিক নীতিগুলির ওপরও ক্রমাগত আঘাত আসছে। এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে তিনি প্রত্যেকটি প্রকৃত দেশপ্রেমিক ভারতীয় নাগরিককে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান, যাতে সাম্প্রদায়িকতা রুখে দেশে একটি ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি করা যায়।
আয়োজিত এই সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মৌলানা মদানি একাধিক সমসাময়িক বিষয়ে মুখ খোলেন। রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মৌলানা মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ ভেঙে ফেলার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তার তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি। বিষয়টিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “আমি মনে করি জওহর বিশ্ববিদ্যালয় থাকা উচিত, এটি ভেঙে ফেলা সম্পূর্ণ ভুল”। তিনি যুক্তি দেন, যদি নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনও আইনি ত্রুটি বা আনুষ্ঠানিক খামতি থেকেও থাকে, তবে সরকার জরিমানা করতে পারে, কিন্তু হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে গুঁড়িয়ে দেওয়া কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এর পাশাপাশি দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রশ্নফাঁস কাণ্ড নিয়ে চলমান ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, লক্ষ লক্ষ তরুণের ভবিষ্যৎ জড়িত থাকায় বিষয়টিকে অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে সমাধান করা দরকার। অন্যদিকে, বারাণসীর জ্ঞানবাপী মামলায় সুপ্রিম কোর্টের মধ্যস্থতার প্রস্তাব নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, যদি উভয় পক্ষই সংলাপে বসতে রাজি না হয়, তবে জোর করে কিছু করা সম্ভব নয়।
লখনউয়ের অটল বিহারী বাজপেয়ী সায়েন্টিফিক কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে মৌলানা মদানি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বারাণসীর সংকট মোচন মন্দিরের মহন্ত তথা আইআইটি বারাণসীর অধ্যাপক বিশ্বম্ভর নাথ মিশ্র, প্রবীণ আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং সহ খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এবং শিখ সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা। প্রত্যেকেই একযোগে দেশের প্রাচীন মিশ্র সংস্কৃতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে বজায় রাখার ওপর জোর দেন।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

