নয়াদিল্লি, ২৮ জুলাই: “প্রিয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, আপনি যখন এখন ইস্তফা গ্রহণ করা শুরুই করেছেন, তখন দয়া করে আমারটাও গ্রহণ করুন। দেখতে দেখতে ৭ বছর পার হয়ে গেল!!”— সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) ঠিক এই ভাষাতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চরম উপহাস ও কটাক্ষ করলেন ২০১২ ব্যাচের প্রাক্তন আইএএস কর্মকর্তা কান্নান গোপীনাথন। সম্প্রতি ছাত্র আন্দোলন ও ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) চাপের মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর তাঁর ইস্তফাপত্র তড়িঘড়ি মঞ্জুর করে কেন্দ্র। সেই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে নিজের দীর্ঘদিনের বকেয়া ইস্তফাপত্র নিয়ে ফের সরব হয়েছেন ৪১ বছর বয়সী এই প্রাক্তন আমলা।
অরুণাচল প্রদেশ-গোয়া-মিজোরাম এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (এজিএমইউটি) ক্যাডারের কর্মকর্তা কান্নান গোপীনাথন ২০১৯ সালে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। তবে সাত বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও কেন্দ্রীয় সরকার তাঁর পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান কোনোটিই করেনি। ‘এক্স’-এ এক নেটিজেন তাঁকে প্রশ্ন করেন, চাকরির নথি চূড়ান্ত না হওয়ায় সরকার কি এখনও তাঁকে বেতন দিচ্ছে? জবাবে গোপীনাথন লেখেন, “না, কোনো বেতন নেই, কোনো সাসপেনশনও নেই, কিছুই নেই। সরকার স্রেফ ফাইলটার ওপর চেপে বসে আছে। ঠিক যেমন দেশের অন্য সব গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার ক্ষেত্রে বসে থাকে”।
অন্য এক ব্যবহারকারী মজা করে তাঁকে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করার পরামর্শ দিলে, প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাম্প্রতিক ইনস্টাগ্রাম-প্রীতি ও চিত্রনাট্য নির্ভর উপস্থাপনাকে তির্যক আক্রমণ করে গোপীনাথন লেখেন, “ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল সেট করছি… নতুন টেলিপ্যাডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে”। উত্তরে অপর এক ইউজার যখন বলেন, “আগে আপনার মেকআপ আর্টিস্ট আর পোশাক তৈরি রাখুন”, তখন গোপীনাথনের তাৎক্ষণিক উত্তর ছিল, “তারাও সবাই ইস্তফা দিয়ে চলে গেছে”।
২০১৯ সালে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর জম্মু ও কাশ্মীরে যেভাবে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, সমস্ত যোগাযোগ মাধ্যম স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং স্থানীয় নেতা-সাংবাদিকদের বন্দি করা হয়েছিল—তার প্রতিবাদেই চাকরি ছাড়েন গোপীনাথন। তাঁর কথায়, “একটি গণতান্ত্রিক দেশে কোনো রাজ্যকে এভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা যায় না। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকায় আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং আজও নিজের সেই অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে আছি”। পরবর্তীতে তিনি কেরালা বন্যা এবং নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধেও সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন।
চাকরি ছাড়ার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে কান্নান গোপীনাথন আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে যোগ দেন। সর্বভারতীয় সেবা আচরণ বিধি (All-India Services Conduct Rules) অনুযায়ী, সরকারি পদে থাকা অবস্থায় কোনো আমলা সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিতে পারেন না। ফলে তাঁর পদত্যাগপত্র ঝুলিয়ে রেখে কেন্দ্র তাঁকে এক অভূতপূর্ব প্রশাসনিক আইনি জটিলতায় দাঁড় করিয়েছে।
গোপীনাথন জানান, ইস্তফার দুই মাস পর তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছিল এবং ইউপিএসসি (UPSC) জানিয়েছিল সরকারি চাকরিতে থেকে সরকারের সমালোচনা করায় তাঁর পে-স্কেল বা বেতনক্রম কমিয়ে দেওয়া হবে। গোপীনাথনের পাল্টা প্রশ্ন, “যেখানে আমি বছরের পর বছর ধরে কোনো বেতনই পাচ্ছি না, সেখানে পে-স্কেল কমানোর অর্থ কী?” একই সময়ে ২০১৯ সালে পদত্যাগ করা তাঁর অন্য সহকর্মী শশिकांत সেন্থিলের ইস্তফা ২০২২ সালেই গৃহীতি হলেও গোপীনাথনের ক্ষেত্রে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও কর্মী এবং প্রশিক্ষণ বিভাগে (DoPT) পড়ে রয়েছে।
এক সাক্ষাৎকারে গোপীনাথন ব্যঙ্গ করে বলেন, “আমি হয়তো দেশের সবচেয়ে সুবিধাভোগী সিভিল সার্ভেন্ট। যখন ইচ্ছা আন্দোলনে নামতে পারি, আবার যখন ইচ্ছা চাকরিতে ফিরতেও পারি, সরকার আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে”। কেন্দ্রের এই পক্ষপাতমূলক ও মন্থর আমলাতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে সরব হয়ে গোপীনাথন এখন সামাজিক মাধ্যমে মোদী সরকারের নীতি ও মনোভাবকে তীব্র খোঁচায় বিদ্ধ করে চলেছেন।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
