পাটনা, ২৭ জুলাই: বিহারের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন ও গণপ্রতিরোধ এক নতুন এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড়ে এসে পৌঁছেছে। আন্দোলনের জেরে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, রাজপথে নামা ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর প্রশাসনিক অন্যায় ও পুলিশের অমানবিক দমনপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই আরও তীব্র করার বার্তা দিল বামপন্থী ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA)। সোমবার পাটনায় আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা স্পষ্ট ও কড়া ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, আন্দোলন চলাকালীন গ্রেফতার হওয়া প্রতিটি প্রতিবাদী ছাত্র এবং যুবনেতা যতক্ষণ না নিঃশর্তে মুক্তি পাচ্ছেন, ততক্ষণ এই আন্দোলন এক চুলও থামবে না।
সংবাদ সম্মেলনে বোরার হুঙ্কার, “গণতান্ত্রিক দেশে ভিন্নমত প্রকাশ করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার। বুলেট বা জেলের গরাদ দিয়ে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।”
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৬ সালের জুলাই মাসের শুরু থেকেই। নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি এবং রাজ্য ও কেন্দ্রের শিক্ষানীতির নানা গলদের প্রতিবাদে বিহার জুড়ে রাজপথে নেমেছিলেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। সেই শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে ছত্রভঙ্গ করতে বিহার পুলিশ মারাত্মক বলপ্রয়োগ করে বলে অভিযোগ।
তথ্য অনুযায়ী, বিহারের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আন্দোলনরত ১০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী, ছাত্রনেতা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে পুলিশ গ্রেফতার করে জেলে পুরেছে। এর মধ্যে রয়েছেন এআইএসএ-র একাধিক শীর্ষস্থানীয় সক্রিয় কর্মী এবং সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের বিধায়ক সন্দীপ সৌরভ। আন্দোলনকারীদের দমাতে তাঁদের বিরুদ্ধে ৩০৭ ধারা অর্থাৎ ‘হত্যার চেষ্টা’ (Attempt to Murder)-র মতো অত্যন্ত গুরুতর ও অজামিনযোগ্য ধারায় পুলিশ মামলা দায়ের করেছে। অথচ আন্দোলনের প্রাথমিক ধাক্কায় কেন্দ্রীয় স্তরে মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, যা বাস্তবায়িত করেনি রাজ্য প্রশাসন।
বিহার সফরে এসে নেহা বোরা কেবল সংবাদ সম্মেলনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি নিজে পাটনা সহ অন্যান্য জেলার কারাগারে গিয়ে কারারুদ্ধ ছাত্রনেতা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করেন। একই সাথে পুলিশি হয়রানির শিকার হওয়া আন্দোলনকারীদের পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
সংবাদ সম্মেলনে সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে নেহা বলেন, “যে ছাত্রদের হাতে কলম এবং বই থাকার কথা ছিল, তাদের অপরাধীদের মতো জেলে আটকে রাখা হয়েছে। কেবল প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অপরাধে তরুণদের ভবিষ্যত ধ্বংস করার চক্রান্ত করছে সরকার। তবে পরিবারগুলি ভেঙে পড়েনি, তারাও এই আইনি লড়াইয়ে আমাদের পাশে রয়েছে।”
প্রশাসনের এই অতি-সক্রিয়তা এবং মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে পরবর্তী রূপরেখা ঘোষণা করেছে এআইএসএ এবং বিপ্লবী যুব অ্যাসোসিয়েশন (RYA)। যৌথ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগামী ৩০ জুলাই পুরো বিহার রাজ্য জুড়ে এক বিশাল ও ব্যাপক প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে।
এই কর্মসূচির প্রধান দাবিগুলি হলো:
- গ্রেফতার হওয়া সমস্ত ছাত্র, যুবনেতা এবং বিধায়ক সন্দীপ সৌরভের বিরুদ্ধে দায়ের করা বয়ান ও মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
- জেলের ভেতর থাকা সমস্ত আন্দোলনকারীকে সম্পূর্ণ নিঃশর্তে মুক্তি দিতে হবে।
- নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের আসল মূলহোতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে।
৩০ জুলাইয়ের রাজ্যব্যাপী প্রতিবাদের ডাক সামনে আসতেই বিহারের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অলিন্দে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে বিরোধী শক্তিগুলি ছাত্র আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়াতে শুরু করেছে, অন্যদিকে রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রুখতে প্রস্তুত হচ্ছে। এআইএসএ নেতৃত্বের এই অনমনীয় অবস্থান প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, সরকার নীতিগতভাবে কিছুটা নমনীয় হলেও রাজপথের এই লড়াই নিকট ভবিষ্যতে থামার কোনো সম্ভাবনা নেই।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
