শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নাগরিক অধিকার, বাড়াবাড়ির কোনো সুযোগ নেই: নিট আন্দোলন দমনে পুলিশি ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ সুপ্রিম কোর্টের

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নাগরিক অধিকার, বাড়াবাড়ির কোনো সুযোগ নেই: নিট আন্দোলন দমনে পুলিশি ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ সুপ্রিম কোর্টের

নতুন দিল্লি, ২৭ জুলাই: নিট (NEET) পরীক্ষা বাতিলের দাবি ও প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রতিবাদী ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগ ও চরম মারধরের ঘটনায় রাজ্য তথা জাতীয় রাজনীতিতে বড়সড় তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই আবহে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে এবার সরাসরি অসন্তোষ প্রকাশ করল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। মামলার শুনানিকালে ভারতের প্রধান বিচারপতি (CJI) সূর্য কান্ত অত্যন্ত কড়া সুর বজায় রেখে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো আন্দোলন বা বিক্ষোভ কখনোই পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অজুহাত হতে পারে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ ও প্রতিবাদ করার পূর্ণ অধিকার দিয়েছে।

‘বার অ্যান্ড বেঞ্চ’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, সাম্প্রতিক নিট প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির তদন্ত এবং আন্দোলনের সময় দিল্লি পুলিশের দমনপীড়ন নিয়ে দায়ের হওয়া একগুচ্ছ আবেদনের শুনানি চলছিল সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ বেঞ্চে। শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ পুলিশের ভূমিকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, “পরীক্ষা সংক্রান্ত চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখন শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামছেন, তখন প্রশাসনকে আরও অনেক বেশি সংবেদনশীল হতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা কোনো অপরাধী নন। কোনো আন্দোলন বা বিক্ষোভ তৈরি হলেই সেখানে সীমার বাইরে গিয়ে পুলিশি শক্তি প্রয়োগ করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। নাগরিকের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আইনি অধিকারকে রাষ্ট্র জোর করে দমন করতে পারে না।”

মামলার নিষ্পত্তিকালে সর্বোচ্চ আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টিতেও গুরুত্ব প্রদান করেছেন। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আন্দোলন চলাকালীন সহিংসতা যেমন বরদাস্ত করা হবে না, তেমনই উদ্ধার ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মীদের জীবনও একইভাবে মূল্যবান।

বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনা মন্তব্য করেন, “গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের নামে হিংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করা যেমন অনুচিত, ঠিক তেমনই নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর চরম নমনীয়তা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখা দরকার। মনে রাখতে হবে, সাধারণ নাগরিকের জীবনের মতো প্রতিটি পুলিশ কর্মীর জীবনের মূল্যও সমান। তাই উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।”

যন্তর মন্তর এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিট কাণ্ডকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে। আন্দোলন ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের মতো পরিস্থিতি কীভাবে সামলানো উচিত, সে বিষয়ে পুরো দেশের জন্য একটি অভিন্ন জাতীয় প্রোটোকল (Uniform National Protocol) তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে শীর্ষ আদালত।

আদালতের মতে, রাজ্য বা কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনী প্রায়শই বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস, জলকামান, লাঠিচার্জ কিংবা পেলেট বন্দুকের মতো মারাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট ও প্রমিত নিয়ম থাকা অত্যন্ত জরুরি, যা সারা দেশে একইভাবে কার্যকর করা সম্ভব হবে।

নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন এবং আন্দোলনকারীদের ওপর দমনপীড়ন সংক্রান্ত সমস্ত আবেদনগুলি একত্রে যুক্ত করে পরবর্তী কার্যদিবসে তালিকার শীর্ষে রেখে শুনানির নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চ। মঙ্গলবারেই এই বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশ জারি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সারাদেশে যখন লাখ লাখ শিক্ষার্থী নিজেদের ভবিষ্যতের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন, ঠিক সেই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া অবস্থান পুলিশ প্রশাসন এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ওপর বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করল বলেই মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply