জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ টির মধ্যে ৩৮টি ভবন ভাঙার নির্দেশ রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের

জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ টির মধ্যে ৩৮টি ভবন ভাঙার নির্দেশ রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের

রামপুর, ৮ অগাস্ট: উত্তরপ্রদেশের রামপুরে অবস্থিত প্রখ্যাত মহম্মদ আলি জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব বর্তমানে এক গভীর এবং অভাবনীয় সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। অল্ট নিউজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ জুবায়েরের শেয়ার করা একটি বিস্তারিত ও তথ্যবহুল প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে, রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা আরডিএ সম্প্রতি এই সুপরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৪০টি মূল ভবনের মধ্যে ৩৮টি ভবনই সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলার নির্দেশ জারি করেছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে জারি করা এই আকস্মিক নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে শিক্ষা মহল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে প্রবল বিতর্ক এবং এক জটিল আইনি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক দাবি করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালে তাদের প্রশাসনিক এক্তিয়ার বা ভৌগোলিক কাজের পরিধি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্প্রসারিত হওয়ার পর তারা লক্ষ্য করেছে, এই সুবিশাল ভবনগুলোর নির্মাণকাজে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। মূলত অনুমোদনহীন এবং বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ তুলেই আরডিএ এই ব্যাপক ধ্বংসের নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে।

সমাজবাদী পার্টির প্রবীণ নেতা এবং প্রাক্তন মন্ত্রী আজম খানের একান্ত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে অবশ্য রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে এবং দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট দাবি, তাদের ক্যাম্পাসের সমস্ত ভবনের নির্মাণকাজ আজ থেকে এক দশক আগে, অর্থাৎ ২০১৬ সালের মধ্যেই সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি সহ অন্যান্য সমস্ত আইনি এবং শিক্ষাগত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যাবতীয় প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং ছাড়পত্র মেনেই সম্পূর্ণ বৈধভাবে নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল। তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন নথিপত্রের অভাবের কথা বলা হচ্ছে? এর উত্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিকারিকরা জানিয়েছেন যে, ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি অতি-সক্রিয় পুলিশি অভিযান বা তল্লাশি চালানো হয়েছিল। কর্তৃপক্ষের সরাসরি অভিযোগ, সেই তল্লাশি অভিযানের সময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণ ও অনুমোদন সংক্রান্ত একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র হারিয়ে যায় অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে সরিয়ে ফেলা হয়। যার কারণে বর্তমানে তারা অনুমোদনের পুরোনো কাগজপত্রগুলো যথাযথভাবে আরডিএ-র সামনে প্রদর্শন করতে পারছে না।

এর পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আরও একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরেছে। তারা জানিয়েছে যে, এই সুবিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নয়নের একটি নির্দিষ্ট অংশ সাধারণ মানুষের করের টাকা বা সরকারি তহবিলের আর্থিক সহায়তায় নির্মিত হয়েছে। তাই এগুলো ভেঙে ফেলা হলে তা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রেরই আর্থিক ক্ষতি সাধন করবে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, উত্তরপ্রদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজ্য সরকারের সঙ্গে সমাজবাদী পার্টির প্রভাবশালী নেতা আজম খানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শত্রুতা এবং বিরোধের জেরেই সম্পূর্ণ প্রতিহিংসামূলকভাবে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ব্যক্তিগত আক্রোশের বলি হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠিত উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান, এমনটাই মনে করছেন অনেকে।

এই প্রশাসনিক, আইনি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জাঁতাকলে পড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ও নিরপরাধ শিক্ষার্থীরা। সংবাদমাধ্যমের প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে মহম্মদ আলি জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় তিন থেকে চার হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন কোর্সে অধ্যয়নরত রয়েছেন। ভবন ভেঙে ফেলার এই মারাত্মক নির্দেশের পর থেকে এই বিপুল সংখ্যক পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষাজীবন এক চরম অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি বর্তমানে এতটাই ঘোরালো হয়ে উঠেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তির প্রক্রিয়াও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি ক্যাম্পাস চত্বর থেকে একটি অ্যাডমিশন কাউন্সেলিং ক্যাম্প জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে নতুন ভর্তি হতে আসা শিক্ষার্থীদের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই ধরনের বৈষম্যমূলক এবং হতাশাজনক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীরা ইতিমধ্যেই তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেছেন এবং ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন।

তবে আপাতত সাময়িক স্বস্তির বিষয় হলো, আগামী ১০ অগাস্ট, ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত এই ভবন ভাঙার নির্দেশের ওপর আইনিভাবে একটি অস্থায়ী স্থগিতাদেশ বা স্টে অর্ডার জারি রয়েছে। বর্তমানে বিভাগীয় কমিশনার এবং এলাহাবাদ হাইকোর্টে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলাটির আইনি প্রক্রিয়া এবং শুনানি বিচারাধীন রয়েছে। আদালত এবং প্রশাসনের চূড়ান্ত রায়ের ওপরই এখন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এর সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

https://x.com/zoo_bear/status/2085965276445626606?s=20

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply