মুম্বই, ৮ অগাস্ট:
মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস বা টিস-এর দুই শিক্ষার্থীর আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দিল মুম্বই আদালত। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের অক্টোবরে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন পড়ুয়া এবং বর্তমানে কারাবন্দি সমাজকর্মী উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের সমর্থনে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে ওই দুই পড়ুয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার মুম্বইয়ের একটি দায়রা আদালত এই কড়া নির্দেশ প্রদান করেছে। তবে এই একই ঘটনায় অভিযুক্ত আরও সাতজন শিক্ষার্থীকে আদালত আগাম জামিন মঞ্জুর করেছে। উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ অক্টোবর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক প্রয়াত জি এন সাইবাবার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য টিস ক্যাম্পাসের ভেতরে ওই শিক্ষার্থীরা কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই জড়ো হয়েছিলেন। সাইবাবার সেই স্মরণসভাতেই নিষিদ্ধ মতাদর্শের প্রচার এবং বিতর্কিত স্লোগান দেওয়ার অভিযোগেই তাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে পুলিশ।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্টে জানানো হয়েছে যে, শুক্রবার শুনানির সময় আদালত তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, জি এন সাইবাবার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা কোনোভাবেই আইনের চোখে বেআইনি কাজ নয়, কারণ মৃত্যুর আগে তিনি বোম্বে হাইকোর্ট থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন। কিন্তু আগাম জামিন খারিজ হওয়া ওই দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো, তারা এমন ব্যক্তিদের সমর্থনে প্রকাশ্যে স্লোগান দিয়েছিলেন যাদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ বা বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনের মতো কঠোর ধারায় মামলা চলছে। উমর খালিদ এবং শারজিল ইমাম ২০২০ সালের উত্তর-পূর্ব দিল্লির ভয়াবহ দাঙ্গার ষড়যন্ত্রের মামলায় বর্তমানে বিচারাধীন বন্দি হিসেবে গত পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে জেলে রয়েছেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টও তাদের জামিনের আবেদন একাধিকবার খারিজ করে দিয়েছে। পুলিশি এফআইআর অনুযায়ী, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ধর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা ছড়ানো, জাতীয় সংহতি ও অখণ্ডতার পরিপন্থী বিবৃতি দেওয়া এবং বেআইনিভাবে জমায়েত হওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। টিস প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের দায়ের করা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই ট্রম্বে পুলিশ শুরুতে এই মামলা দায়ের করেছিল এবং পরবর্তীকালে তদন্তের ভার মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
বিশেষ সরকারি আইনজীবী শিশির হিরে আদালতে ওই দুই পড়ুয়ার আগাম জামিনের তীব্র বিরোধিতা করে জোরালো সওয়াল করেন। তিনি আদালতকে তথ্যপ্রমাণ সহ জানান যে, অভিযুক্তদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা ল্যাপটপ এবং মোবাইল ফোনে মাওবাদী মতাদর্শকে সমর্থন করে এমন প্রচুর ডিজিটাল নথিপত্র এবং বই পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চিনের কমিউনিস্ট নেতা মাও জেদং, রুশ বিপ্লবের নেতা ভ্লাদিমির লেনিন এবং নিষিদ্ধ সংগঠন সিপিআই (মাওবাদী)-এর বিভিন্ন প্রকাশনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে পুলিশের দাবি। যদিও শিক্ষার্থীদের আইনজীবী বিজয় হিরেমাঠ আদালতে পাল্টা দাবি করেন যে, এই সমস্ত বই ও তথ্য ইন্টারনেট বা খোলা বাজারে খুব সহজেই পাওয়া যায় এবং এগুলো সংগ্রহে থাকলেই কেউ মাওবাদী হয়ে যায় না বা এটা কোনো অপরাধ নয়। তিনি আরও যুক্তি দেন যে, ওই স্মরণসভাটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত, যেখানে মূলত প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল এবং জি এন সাইবাবার লেখা কবিতা পাঠের মাধ্যমে শান্তি ও সমতার বার্তা দেওয়া হয়েছিল। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরাও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো গুজবের কথা উল্লেখ করে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তবে আদালত মনে করেছে যে, বাজেয়াপ্ত হওয়া বৈদ্যুতিন সামগ্রী এবং খালিদ-ইমামের সমর্থনে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগের যথেষ্ট পারিপার্শ্বিক ভিত্তি রয়েছে, যা ওই দুই পড়ুয়ার আগাম জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আইনি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক জি এন সাইবাবা প্রায় ৯০ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতেন। মাওবাদীদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাকে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা ইউএপিএ-র অধীনে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং ২০১৭ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দীর্ঘ সাত বছরের বেশি সময় নাগপুর সেন্ট্রাল জেলে কাটানোর পর, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে বোম্বে হাইকোর্ট উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে তাকে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়ে বেকসুর খালাস করে। কিন্তু কারামুক্ত হওয়ার মাত্র সাত মাস পর, গত বছরের ১২ অক্টোবর হায়দরাবাদের একটি হাসপাতালে গলব্লাডার অস্ত্রোপচার-পরবর্তী শারীরিক জটিলতার কারণে তার অকাল মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর প্রথম বর্ষপূর্তিতে আয়োজিত স্মরণসভাকে কেন্দ্র করেই টিস ক্যাম্পাসে এই নতুন আইনি বিতর্কের সূত্রপাত হয়। বিচারক তার চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন, দেশের উচ্চশিক্ষিত এবং ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দেশের আইনকানুন মেনে চলার বেশি প্রত্যাশা করা হয়। যে সাতজন শিক্ষার্থীকে আদালত স্বস্তি দিয়ে জামিন মঞ্জুর করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কেবল ওই স্মরণসভায় উপস্থিত থাকার অভিযোগ ছিল এবং তাদের কাছ থেকে কোনো আপত্তিকর বা বিতর্কিত সামগ্রী উদ্ধার হয়নি। তবে বাকি দুই পড়ুয়ার জামিন নাকচ হওয়ায় তাদের সামনে আইনি লড়াইয়ের পথ এখন আরও দুর্গম হয়ে পড়ল।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.