নয়াদিল্লি, ১ আগস্ট: গবাদি পশু জবাইয়ের অভিযোগকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রদেশের খাণ্ডবায় ২৫টি মুসলিম পরিবারের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার যে প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল, তাতে কড়া হস্তক্ষেপ করল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট এক অন্তর্বর্তী নির্দেশে ওই ২৫টি পরিবারের বসতবাড়ির ওপর কোনো প্রকার ভাঙচুর বা উচ্ছেদ না চালানোর জন্য রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে। ‘মাকতুব মিডিয়া’ (Maktoob Media)-র বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি এবং বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ আবেদনকারীদের যুক্তির গুরুত্ব অনুধাবন করে এই সুরক্ষা কবচ প্রদান করেছে। এর ফলে অবিলম্বে গৃহহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় দিন কাটানো ২৫টি পরিবারের ওপর থেকে সাময়িক হলেও উচ্ছেদের তলোয়ার সরে গেল।
ঘটনার সূত্রপাত মধ্যপ্রদেশের খাণ্ডবা জেলার একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে। স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের দাবি, ওই এলাকায় বেআইনিভাবে গবাদি পশু জবাই করার কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল। এই অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ করে এবং অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে তাঁদের বাড়ি ভেঙে ফেলার জন্য নোটিশ জারি করে।
প্রশাসনের বক্তব্য ছিল, যেসব বাড়িতে এই ধরনের কর্মকাণ্ড হয়েছে, সেগুলি বেআইনি নির্মাণ এবং সরকারী জমির ওপর অবৈধ দখলদারিত্বের অংশ। এরপরই এলাকায় এক ডজনেরও বেশি বুলডোজার এনে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে প্রশাসন।
হুমকির মুখে পড়া ২৫টি পরিবারের সদস্যরা প্রশাসনের এই একতরফা ও তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্তকে চরম বেআইনি ও অসাংবিধানিক অ্যাখ্যা দিয়ে অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। আবেদনকারীদের পক্ষে উপস্থিত আইনজীবীরা আদালতে সওয়াল করেন যে, কেবল কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ বা সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে কারও একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
আইনজীবীরা উল্লেখ করেন যে, এটি স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি (Natural Justice) এবং সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক জীবনের অধিকারের চরম লঙ্ঘন। ঘরবাড়ি উচ্ছেদের নোটিশ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে আক্রান্ত পরিবারগুলো নিজেদের আইনি প্রতিরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সময় পর্যন্ত পায়নি।
মামলাটির জরুরি গুরুত্ব অনুধাবন করে সুপ্রিম কোর্ট উভয় পক্ষের প্রাথমিক বক্তব্য গ্রহণ করে। শুনানিকালে শীর্ষ আদালত প্রশ্ন তোলে, অপরাধের অভিযোগের তদন্ত এবং আইনানুযায়ী শাস্তির প্রক্রিয়া আলাদা বিষয়, কিন্তু আদালত বা উপযুক্ত বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া কীভাবে প্রশাসনিক আদেশে সরাসরি কারও বাসগৃহ ধূলিসাৎ করে দেওয়া হতে পারে?
এরপরই সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দেয় যে, পরবর্তী শুনানি ও নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই ২৫টি মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ির ওপর কোনো বুলডোজার চালানো যাবে না এবং কোনো নাগরিককে জোর করে উচ্ছেদ করা চলবে না। একই সাথে মধ্যপ্রদেশ সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে এই বিষয়ে তাঁদের জবাব পেশ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলেই অভিযুক্ত বা তাঁদের আত্মীয়দের বাড়িঘর সরকারি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ সমাজে ‘বুলডোজার জাস্টিস’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা কারণ তা আইনের শাসন (Rule of Law)-কে পাশ কাটিয়ে প্রশাসনিক স্বৈরাচারকে প্রাধান্য দেয়।
সুপ্রিম কোর্টের এই অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ কেবল খাণ্ডবার ২৫টি পরিবারের জন্য স্বস্তি নয়, বরং দেশের সাংবিধানিক কাঠামো রক্ষা করার ক্ষেত্রেও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্কেপ। আইনের চোখে বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রশাসনিকভাবে গৃহহীন করে দেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠছিল, তাতে সুপ্রিম কোর্টের এই স্পষ্ট অবস্থান ইতিবাচক বার্তা দিল বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

