কলকাতা, ১ আগস্ট: সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভাষা, সংস্কৃতি ও শব্দচয়ন নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের জবাব দিতে আবার কলম ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘শুক্রবারিয়া’ বা ‘শুভ্রবারিয়া’ শব্দটির ব্যবহার এবং তা ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক জলঘোলাকে কেন্দ্র করে এক তীব্র প্রতিবাদী বার্তা ফুটে উঠেছে তাঁর সদ্য রচিত কবিতা ‘শুভ্রবারিয়া’-য়। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যস্ততার মাঝেও সাহিত্যকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করার যে দীর্ঘ ঐতিহ্য তাঁর রয়েছে, এই কবিতাটি তারই এক অনন্য সংযোজন।
রাজনীতির আঙিনায় বিরোধীদের তোপ এবং শব্দ প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই কবিতার প্রতিটি চরণে তিনি সংস্কৃতি, সর্বধর্ম সমন্বয় এবং ভাষাগত ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ছন্দের মাধ্যমে তিনি যেমন নিজের রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন, তেমনই কটাক্ষ করেছেন সমালোচকদের।
প্রকাশিত কবিতায় সূচনাতেই রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের এক কঠোর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম চরণে লেখা হয়েছে— “অত্যাচারের সীমানা ছাড়িয়ে / বাংলার বেশিটাই হয়েছে কারাগার!” এই পংক্তির মাধ্যমে সমাজে চেপে বসা অস্থিরতা ও বিরোধীদের রাজনৈতিক আক্রমণকে ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত। একই সাথে প্রকৃতির রূপককে ব্যবহার করে তিনি লিখেছেন, “মেঘের আড়ালে মেঘ হাসছে / বিদ্যুৎ চমকালে জেরবার।”
কবিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু অবশ্য ‘শুভ্রবারিয়া’ শব্দটি ঘিরে ওঠা তর্ক। ভাষা ও অভিধানের দোহাই দিয়ে যাঁরা শব্দপ্রয়োগের সমালোচনা করেছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে সোজা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন কবি। তিনি লিখেছেন— “‘শুভ্রবারিয়া’ কোন অভিধানে? / সঞ্চিত হল এক শব্দ? / ওটাতো সর্বধর্মের সমন্বয়।” অর্থাৎ, রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে যে শব্দকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে, তার গভীরে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যের মেলবন্ধন লুকিয়ে রয়েছে, তা রাজনৈতিক বিরোধীরা বুঝতে ব্যর্থ— এমনটাই বোঝাতে চেয়েছেন তিনি।
কবিতাটির একটি বিশেষ অংশে প্রতিপক্ষকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে। সেখানে ব্যবহৃত ‘গর্দভশক্তি’ শব্দটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক চর্চার জন্ম দিয়েছে। কবিতায় লেখা হয়েছে— “গর্দভশক্তিদের ক্ষমতা আছে বোঝার অব্দ / সোম থেকে শুক্র— / প্রতিদিনই ‘শিব’ থেকে ‘সন্তোষীমাতা’ / ‘গর্দভশক্তি’ ধর্ম কি মানে? / আছে কি তাদের ভক্তি?”
এখানে সপ্তাহে প্রতিটি দিনের ধর্মীয় গুরুত্ব ও শিব বা সন্তোষীমাতার মতো পৌরাণিক প্রসঙ্গের অবতারণা করে তিনি বিরোধীদের ‘ভণ্ডামি’ ও সংকীর্ণতার দিকে আঙুল তুলেছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও সার্বজনীন প্রসঙ্গ টেনে এনে খ্রিস্টানদের পবিত্র দিন ‘গুড ফ্রাইডে’-র উল্লেখ করা হয়েছে। কবিতার ভাষায়— “‘গুড ফ্রাইডে’ কথাটা কি সবার অজানা / তবে কেন এ অমূল্য উক্তি? / ‘শুভ্রবারিয়া’!!!” এর মাধ্যমে ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সকল বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বার্তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কবিতার শেষভাগে বাংলা ভাষা, শব্দকোষ এবং ঐতিহ্যের প্রতি গভীর আনুগত্য প্রকাশ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী তথা কবি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ভাষার শক্তি অপরিসীম এবং সেই শক্তিকে অসম্মান করলে তার পরিণতি ভালো হয় না। তিনি লিখেছেন— “শব্দকোষ— ভাষার কথা / কথাবিতানে গাঁথা। / অসম্মান করলে ভুগতে হবে / নতজানু হবে মাথা।।”
কলকাতার রাজনৈতিক অলিন্দে এই কবিতাটি প্রকাশের পর থেকেই রাজনৈতিক পারদ চড়তে শুরু করেছে। একাংশের মতে, কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা বা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমেই নয়, বরং সাহিত্যের রসকে কাজে লাগিয়ে বিরোধীদের সমস্ত সমালোচনার জবাব দেওয়া মমতার পুরনো কৌশল। এই কবিতাটি সেই ধারারই একটি বলিষ্ঠ নিদর্শন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন, অন্যদিকে বাংলা ভাষা ও সর্বধর্ম সমন্বয়ের মৌলিক ভাবধারাকে রক্ষার বার্তা দিয়েছেন।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

